ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

ইরানের ওপর হামলা

সিনেটে ঐতিহাসিক বিল পাস, ট্রাম্পকে প্রতীকী ভর্ৎসনা

হরমুজে নৌযান চলাচল বেড়েছে তিন গুণ

সিনেটে ঐতিহাসিক বিল পাস, ট্রাম্পকে প্রতীকী ভর্ৎসনা
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ-ক্ষমতার ওপর লাগাম টানতে একটি বিল পাস হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ দিয়ে এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস করেন সিনেটররা। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ৫০টি ও বিপক্ষে ৪৮টি ভোট পড়ে। 

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এর আগে চলতি মাসের শুরুতে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হয়েছিল। তখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, সিনেটে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় এটি পাস করা প্রায় অসম্ভব হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে চারজন রিপাবলিকান সিনেটর দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দেন। 

১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট প্রণয়নের পর এই প্রথম মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে কোনো প্রেসিডেন্টের সামরিক পদক্ষেপ বন্ধের যৌথ প্রস্তাব পাস হলো। যদিও এই ভোটের সিদ্ধান্তকে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসের একটি প্রতীকী ভর্ৎসনা বা তিরস্কার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ হোয়াইট হাউসের এটি উপেক্ষা করার সুযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, এই প্রস্তাবের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। 

এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই ভোটকে অসময়ের এবং অর্থহীন বলে আখ্যা দেন। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সম্মান দেখাতে বাধ্য হচ্ছে, ঠিক তখনই সিনেট এই অর্থহীন বিল পাস করল। এটি বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে এই বার্তাই দেয়– মার্কিন প্রেসিডেন্ট যা করছেন, তা পার্লামেন্ট পছন্দ করছে না। 

পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন নিয়ে বিরোধ 
যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান তাদের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রবেশাধিকার দিতে রাজি হয়েছে।

তবে তেহরান এ দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সুইজারল্যান্ডের শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়া ইরানের প্রতিনিধি দল জানিয়েছে, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের আমন্ত্রণ জানানোর কোনো পরিকল্পনাও তাদের নেই। 
এর আগে গত জুনে যুদ্ধ চলাকালীন নিরাপত্তার স্বার্থে আইএইএ পরিদর্শকদের দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছিল ইরান। দেশটির কর্মকর্তারা জানান, পরিদর্শকদের ফিরিয়ে আনার যে কোনো সিদ্ধান্ত শুধু দেশের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল নিতে পারবে। 

হরমুজ প্রণালিতে ওমানের নতুন করিডোর 
শান্তি আলোচনার আরেকটি বড় জটিলতা হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এই জলপথ বন্ধ করে রেখেছিল। ফলে সেখানে প্রায় ১১ হাজার নাবিক আটকা পড়েন। সাময়িক যুদ্ধবিরতির পর জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) এখন এই নাবিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে।
জলপথটি খুলে দেওয়া হলেও ইরান ও ওমান একটি যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রণালির সুরক্ষায় তারা জাহাজ থেকে সার্ভিস ফি আদায়ের একটি নতুন নিয়ম চালু করতে চায়। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মধ্যপ্রাচ্য সফরকালে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে কোনো ধরনের টোল আদায় করতে দেওয়া হবে না।’ ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান টোল আদায়ের চেষ্টা করলে শান্তি আলোচনা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে।

এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ওমান আইএমওর সহায়তায় প্রণালিতে একটি নতুন অস্থায়ী ট্রানজিট করিডোর চালু করেছে। এর মাধ্যমে কোনো ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পারাপার হতে পারছে। ফলে হরমুজে নৌযান চলাচল করছে আগের চেয়ে প্রায় তিন গুণ। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

পরবর্তী আলোচনা আগামী সপ্তাহের শুরুতে
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এ চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক পরাজয়ের ঘোষণা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আজারবাইজানের বাকুতে এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘এই সমঝোতা কোনো চাপের মুখে হয়নি; বরং এটি ইরানি জাতির প্রতিরোধের ফসল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সব বিদেশি সেনা প্রত্যাহার করাই তেহরানের প্রধান লক্ষ্য।’ 
এদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন, আগামী ২৯ ও ৩০ জুন সুইজারল্যান্ডেই দুই দেশের কূটনৈতিক ও কারিগরি দলগুলোর পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এবারের আলোচনার মূল লক্ষ্য থাকবে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বিষয়টির ওপর। 

কুয়েত সফরে গিয়ে রুবিও মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিরাপত্তার গ্যারান্টি স্রেফ কোনো মুখের কথা নয়। এটি বাস্তব।’ এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান বাধাই হলো আমেরিকার সামরিক আগ্রাসন ও হস্তক্ষেপ। আর তাদের মদদপুষ্ট ইসরায়েল পুরো অঞ্চলে গণহত্যা ও সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে।’ 

 

আরও পড়ুন

×