ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ

প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা

প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা
×

খুলনা শিপইয়ার্ড সড়কের গর্তে পানি জমে আছে। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 হাসান হিমালয়, খুলনা

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ২৫ জুন ২০২৬ | ১১:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৩ সালের ৭ মে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হয় সড়কের কাজ। কিন্তু নিম্নমানের কাজ, গাফিলতি ও ধীরগতির কারণে ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের  সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে কেডিএ। এর পর থেকে সড়কের কাজ পুরোপুরি বন্ধ। ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে যাতায়াতে সীমাহীন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। 

এ প্রকল্প ১৩ বছরেও শেষ না হওয়ায় তিন দফা ব্যয় সংশোধন করতে হয়েছে। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল ৯৮ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ২১ জুলাই দ্বিতীয় দফা প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব একনেক সভায় উত্থাপিত হলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দ্রুত কাজ শেষ করার শর্তে ২৫৯ কোটি টাকার দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর আরও ৬ বছর অতিবাহিত হয়েছে। ঠিকাদার বাতিলের পর প্রকল্পের ব্যয় তৃতীয় দফা সংশোধন করে গত ৯ জুন একনেক সভায় উত্থাপন করা হয়। সভায় প্রকল্পটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ দিনেও সড়ক নির্মাণ কেন শেষ হয়নি– জানতে চেয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি। সভা থেকে ফেরত পাঠানো হয় ২৮০ কোটি টাকার সংশোধনী প্রকল্প।

প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ায় ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কের ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অর্ধসমাপ্ত সড়কটি এখন নগরীর ৩০ ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষাধিক মানুষের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বারটি দীর্ঘদিন বেহাল থাকায় ৪-৫ কিলোমিটার পথ ঘুরে নগরীতে প্রবেশ করতে হচ্ছে মানুষকে। দ্রুত সড়কের কাজ শেষ করার দাবিতে অসংখ্যবার মানববন্ধন, মিছিল ও বিক্ষোভ করেছে এলাকার মানুষ। কোনোভাবে কাজটি শেষ করার দাবি জানাচ্ছেন তারা।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, ৩ দশমিক ৭৭৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি প্রশস্ত করতে ৭ দশমিক ৩৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে নৌবাহিনীর মালিকানাধীন খুলনা শিপইয়ার্ডের কিছু জমি ছিল। ছিল মসজিদসহ বিভিন্ন স্থাপনা। মামলাসহ নানা কারণে সড়কের জমি বুঝে পেতে সময় লেগেছে ৯ বছর। 

সড়কের কাজ শুরু করতে ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘আতাউর রহমান লিমিটেড অ্যান্ড মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড’কে (জয়েন্ট ভেঞ্চার) কার্যাদেশ দেয় কেডিএ। ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তাদের সড়কটি ৪ লেনে প্রশস্ত করে পুনর্নির্মাণ, দুই পাশে ড্রেন ও ফুটপাত, সড়কের মাঝে দশমিক ৯২ মিটার ডিভাইডার নির্মাণ, লবণচরায় ৬৬ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু নির্মাণ এবং মতিয়াখালীতে স্লুইসগেট ও কালভার্ট নির্মাণের কথা ছিল। 

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু দুই বছরে তারা অর্ধেক কাজও শেষ করেনি। গাফিলতি ও অবহেলার অভিযোগ তুলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহাবুব ব্রাদার্সের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে কেডিএ। 

প্রকল্প পরিচালক ও কেডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আরমান হোসেন জানান, ২০১৭ সালে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখলে নতুন আইন করে সরকার। এতে সরকারিভাবে জমির অধিগ্রহণ মূল্য তিন গুণ এবং ক্ষতিপূরণ দ্বিগুণ করা হয়। এতেই জমি অধিগ্রহণের খরচ বেড়ে যায় ১২৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া ২০১৩ সালের কাজ ২০২২ সালে শুরু করতে গিয়ে দেখা যায় নির্মাণ সামগ্রীর দামও বেড়ে গেছে। এ জন্য দ্বিতীয় দফা প্রকল্প সংশোধন করতে হয়। ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৫৯ কোটি টাকায়। 

তিনি জানান, সময়মতো কাজ না করায় সরকারের উপদেষ্টা ও সচিবের নির্দেশে ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল ও তার জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আগের ঠিকাদার ২০২১ সালের বাজারদর অনুযায়ী কাজ করছিল। ২০২৬ সালে অসমাপ্ত কাজের নতুন দরপত্র তৈরি এবং অ্যাপ্রোচ রোড কংক্রিটের ঢালাই করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ব্যয় ২০ কোটি টাকা বেড়ে ২৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘একনেকে প্রকল্প ফেরত নিয়ে একেক গণমাধ্যমে একেক রকম সংবাদ দেখছি। মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের এখনও কিছু জানায়নি। একনেক সভার কার্যবিবরণী এখনও হাতে পাইনি। হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে পিপিআর-২০২৫ অনুযায়ী বাকি কাজের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলেই সব জটিলতা কেটে যাবে। এক বছরের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হবে।’ 

কেডিএর নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, শিপইয়ার্ড সড়কটি এখন আমাদের গলার কাঁটা। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও পূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। 

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানাতে জানাতে আমরা ক্লান্ত। এক সড়ক নিয়ে এত ভোগান্তিতে দেশের অন্য কোনো প্রান্তের মানুষ পড়েছে কিনা, জানা নেই। সরকার কাজটি দ্রুত শেষ করবে, এটাই প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন

×