ঢাকা শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা ভাঙা-গড়ার খেলা

অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা ভাঙা-গড়ার খেলা
×

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ভেঙে দেওয়ার পরও পাথর পোড়ানোর জন্য সোনারগাঁয়ের মোজাফফর আলী ফাউন্ডেশনের পাশের একটি চুনা কারখানায় চুল্লি সাজানো হচ্ছে সমকাল

সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৯:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে যেন অবৈধভাবে গড়ে ওঠা চুনা ও ঢালাই কারখানা ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে। চোরাই গ্যাস ব্যবহার করে পরিচালিত এসব কারখানা কিছু দিন পর পর অভিযান চালিয়ে ভেঙে দেয় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। কদিন পরই আবার নতুন করে চালু হয় পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এসব কারখানা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কারখানা তথা চুলা নতুন করে গড়তে খরচ হয় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক এমন কারখানায় অবৈধ সংযোগ নিয়ে মাসে ব্যবহার হচ্ছে কোটি টাকার গ্যাস।

স্থানীয় সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর উপজেলার পিরোজপুর, মোগরাপাড়া ও পৌর এলাকায় অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা স্থাপনের হিড়িক পড়ে। নামমাত্র পুঁজিতে অধিক মুনাফার কারণে এ ব্যবসায় ঝুঁকছেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। প্রশাসনকে অনেকটা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দাপটের সঙ্গে এসব অবৈধ কারখানা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
রাজনৈতিক দাপটের পাশাপাশি যোগসাজশেরও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকটি কারখানার চুনা শ্রমিকরা জানান, চুনা ও ঢালাই কারখানার ব্যবসাটি খুবই লাভজনক। প্রতি সপ্তাহে এসব চুনা কারখানায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা লাভ হয়। ফলে প্রভাবশালীরা পুঁজি ছাড়া এ ব্যবসায় ঝুঁকছেন। প্রতি সপ্তাহে একবার কারখানার চুলা থেকে চুনা নামানো হয়। এর পর মাঝামাঝি সময়ে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে চুলা ভেঙে দেয়। ফলে তাদের তেমন কোনো ক্ষতি হয় না। তা ছাড়া অভিযানের আগে তারা জানতে পেরে প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন। ‘তিতাস গ্যাসের লোকজন’ মাসোহারা নেন বলে জানান কয়েকজন শ্রমিক।

তিতাস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার এসব কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় তিন লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ ঘনফুট গ্যাস অবৈধভাবে ব্যবহার করছে। বর্তমান বাজারমূল্যে যার আর্থিক ক্ষতি মাসে প্রায় এক কোটি টাকা ওপরে। গ্যাস ব্যবহারের ফলে এ বিপুল পরিমাণ টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
সূত্র বলছে, উপজেলার পিরোজপুর মুজাফফর আলী ফাউন্ডেশনের পাশে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার দুই বিএনপির সমর্থকের চুনের কারখানায় অভিযান চালিয়ে আটবার ভেঙে দেওয়া হয়। এ ছাড়া এক বিএনপি কর্মীর কারখানা সাতবার ভেঙে দেওয়া হয়। গত দুই-তিন মাসের মধ্যে এসব অভিযান চালানো হয়। একই এলাকার ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শফিউল আলম বাচ্চু ও তাঁর ভাই নেয়ামত উল্লাহ কারখানায় চারবার অভিযান চালিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। একই ইউনিয়নের ছয়হিস্যা এলাকায় একজন সংসদ সদস্যের ভাগনের কারখানাসহ দুটি কারখানা চারবার ভেঙে দেওয়া হয়। সোনারগাঁ পৌরসভার সাবেক একজন কাউন্সিলরের জামাতার কারখানা তিনবার গুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া সোনাখালী, দমদমা, টিপরদী, আষাঢ়িয়ার চর, ইসলামপুর, দমদমা, বন্দেরা, ইছুবগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা চুনা ও ঢালাই কারখানায় বারবার অভিযান পরিচালনা করে ভেঙে দেওয়া হয়। তবে বিভিন্ন কারখানায় বারবার অভিযান পরিচালনা করলেও পৌরসভা বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার কারখানায় একবারের বেশি অভিযান চালানো হয়নি বলে এলাকাবাসী জানান।
পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি শফিউল আলম বাচ্চু বলেন, অবৈধ চুনা কারখানার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। যারা এ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে অনুরোধ করেন তিনি। ইসলামপুর এলাকায় চুনা কারখানার মালিক মামুন মিয়া বলেন, এক সময় তিনি এ ব্যবসায় জড়িত ছিলেন, এখন নেই। তিনি বলেন, এখন বিভিন্ন জায়গায় চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে ওঠায় প্রশাসনের নজরদারি বেশি থাকে। তাই তিনি এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।

সূত্রমতে, পৌরসভার দৈলেরবাগ এলাকায় পৌর বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা অবৈধ চুনা কারখানা পরিচালনা করছেন। বাগমুছা এলাকায় পৌর বিএনপির নেতা, দিঘিরপাড় এলাকায় পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলরের জামাতা, টিপুরদী এলাকায় নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সাবেক এক নেতা, পিরোজপুর ইউনিয়নের ছয়হিস্যা এলাকায় একজন এমপির ভাগনেসহ দুজন, পিরোজপুর এলাকায় ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ও তাঁর ভাই, পিরোজপুর বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন মুজ্জাফর আলী ফাউন্ডেশনের পাশে সিদ্ধিরগঞ্জ বিএনপির নেতাসহ দুজন এবং স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন কর্মী অবৈধ গ্যাস সংযোগ নিয়ে চুনা ও ঢালাই কারখানা গড়ে তুলেছেন। এ ছাড়া পৌরসভার দুলালপুর, লাহাপাড়া, দীঘিরপাড়, ঝাউচর, আষাঢ়িয়ারচর, ইসলামপুর এবং মোগরাপাড়া ইউনিয়নের সোনাখালী, দমদমা, বন্দেরা ও ইউছুফগঞ্জ এলাকায়ও এ ধরনের কারখানা রয়েছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি মেঘনা ঘাট শাখার ম্যানেজার প্রকৌশলী সুরজিত কুমার সাহার সঙ্গে চুনা ও ঢালাই কারখানার মালিকদের যোগসাজশের অভিযোগ করেছেন অনেকে। যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, যোগসাজশের বিষয়টি সত্য নয়। কারও কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। চুনা কারখানা বন্ধে এখন আমরা অভিযান করে জমির মালিকের বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করেছি। তিনি আরও বলেন, মানুষ অনেক কথা বলবে, সত্য মিথ্যা উদ্ঘাটন দরকার।
নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মোবারক হোসেন বলেন, আবাসিক এলাকায় পাথর পুড়িয়ে চুন তৈরি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ফলে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব কারখানাকে সনদ দেয় না। এসব কারখানা বন্ধ হওয়া জরুরি। তিনি বলেন, পাথর পোড়ানোর ফলে ধোঁয়া থেকে নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং কার্বন মনোক্সাইড বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। এ ছাড়া চুলার ছাই ও চুনের ডাস্ট বাতাসে উড়ে আবাসিক এলাকায় বাতাসকে বিষাক্ত করে। ফলে মানুষের শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা ও চর্মরোগসহ স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের কারখানা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে ফায়ার সনদ দেওয়া হয় না।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের সোনারগাঁ জোনের ডিজিএম মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বলেন, অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করে গড়ে তোলা চুন ও ঢালাই কারখানায় অভিযান চালিয়ে গুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রতি সপ্তাহে তিন-চারবার অভিযান পরিচালনা করছি। এসব কারখানা অল্প টাকায় গড়ে তোলা সম্ভব হওয়ায় বন্ধ করা কঠিন হচ্ছে। এখন কারখানা যার জমিতে গড়ে তোলা হয়, ওই মালিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও জেল জরিমানা করা হচ্ছে। এতে আশা করি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন

×