ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

দলের বিরুদ্ধে দল

২৫ ওয়ার্ডে বিএনপির মুখোমুখি 'বিদ্রোহী' প্রার্থীরা

২৫ ওয়ার্ডে বিএনপির মুখোমুখি 'বিদ্রোহী' প্রার্থীরা
×

কামরুল হাসান

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:০১ | আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:২০

নির্বাচনী প্রচার জমেছে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে। মেয়র পদে সরাসরি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও কাউন্সিলর প্রার্থীরা নির্বাচন করছেন দলের সমর্থন নিয়ে। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যাপারে দলীয় সমর্থন ঘোষণা করেছে। তবে দুই দলেই 'স্বতন্ত্র' অথবা 'বিদ্রোহী' প্রার্থী হিসেবে নিজ নিজ দলের বিরুদ্ধে লড়ছেন সমর্থনবঞ্চিতরানির্বাচনী প্রচার জমেছে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে। মেয়র পদে সরাসরি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও কাউন্সিলর প্রার্থীরা নির্বাচন করছেন দলের সমর্থন নিয়ে। প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যাপারে দলীয় সমর্থন ঘোষণা করেছে। তবে দুই দলেই 'স্বতন্ত্র' অথবা 'বিদ্রোহী' প্রার্থী হিসেবে নিজ নিজ দলের বিরুদ্ধে লড়ছেন সমর্থনবঞ্চিতরা


ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি) নির্বাচনে কমপক্ষে ২৫টি ওয়ার্ডে সমঝোতার চেষ্টা ও কঠোর হুঁশিয়ারির পরও প্রচারাভিযানের মাঠ থেকে সরানো যাচ্ছে না বিএনপির বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীদের। প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে প্রচারকাজও অব্যাহত রেখেছেন তারা। শেষ পর্যন্ত 'নির্বাচনী লড়াই' চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন দলীয় সমর্থন প্রত্যাখ্যাত এসব প্রার্থী। দল সমর্থিত প্রার্থীদের মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে নির্বাচনী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

৯ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময়সীমা পার হওয়ার আগেই দলের পক্ষ থেকে এসব বিদ্রোহী প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যেতে বলা হয়েছিল। দায়িত্বপ্রাপ্ত দলের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে সম্মত করানোর চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে তাদের বিরুদ্ধে দলীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছিল। ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্নিষ্ট বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে আজীবনের জন্য বহিস্কার করা হতে পারে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। এরপরও অনেকেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করে মাঠে রয়ে যান। পরে নির্বাচন কমিশন থেকে তাদের নামে প্রতীক বরাদ্দও দেওয়া হয়। বিদ্রোহী প্রার্থীরা অবশ্য নিজেদের জয়ের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী। তাদের মতে, কাউন্সিলর প্রার্থী সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় না নেওয়ায় তৃৃণমূলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এই অবস্থায় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের চাপের মুখে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে হচ্ছে। দলীয় সমর্থন ছাড়াই জনগণের ভোটে জিতে আসতে পারবেন বলে মনে করছেন তারা।

কয়েকজন নেতা বলেছেন, মূলত দলীয় সমর্থন বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেইে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেও অনেক ওয়ার্ডে বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী হতে দেখা গেছে। একজন নেতার পছন্দের প্রার্থীকে পরাজিত করার জন্য অন্য কোনো জ্যেষ্ঠ নেতা 'বিদ্রোহী প্রার্থী' হতে উস্কানি দিয়েছেন- এমন অভিযোগও রয়েছে। আবার বিদ্রোহী প্রার্থী হলে সাংগঠনিক শাস্তির হুঁশিয়ারিকেও আমলে নেননি অনেকেই। এসব কারণে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির অনেক ওয়ার্ডেই বিদ্রোহী প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়ে গেছেন।

আগামী ৩০ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন হবে। বিএনপি থেকে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে ১৭২টি ওয়ার্ডের দলসমর্থিত প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার পর গত ৩০ ডিসেম্বর ও ৮ জানুয়ারি এসব প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিভিন্ন ওয়ার্ডে শতাধিক দলীয় সমর্থনপ্রত্যাখ্যাত প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের তৎপরতায় অনেকে আবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারও করে নেন। এরপরও উত্তর ও দক্ষিণ সিটির কমপক্ষে ২৫টি সাধারণ ওয়ার্ডেই বিদ্রোহী প্রার্থী রয়ে গেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটিতে ১২ জন এবং দক্ষিণ সিটিতে ১৩ জন বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন। যারা ৯ জানুয়ারি প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে সম্মত হননি।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও উত্তর সিটির সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাছাই কমিটির সমন্বয়কারী মোহাম্মদ শাহজাহান সমকালকে বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময়সীমা পার হওয়ার পর এখনও কিছু কিছু ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী রয়ে গেছেন। দলের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তাদের নির্বাচনে নিবৃত্ত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, এখন যেহেতু মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আর কোনো সুযোগ নেই সেহেতু বিদ্রোহী প্রার্থীদের দলসমর্থিত প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে যেতে বলা হচ্ছে। আশা করছি, তারা দলের এই আহ্বানে সাড়া দেবেন। আর দু-একদিনের মধ্যে সব ওয়ার্ডেই বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে সৃষ্ট সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে।

উত্তরে সমর্থনপ্রত্যাখ্যাত প্রার্থী যারা :ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৫৪টি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টিতে বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাখ্যাত প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে ৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হাজি আবু তৈয়বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জামাল হাসান বাপ্পী। ৫ নম্বর ওয়ার্ডে আনোয়ার হোসেন দলের সমর্থন পেলেও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসানউল্লাহ হাসান সমর্থিত বুলবুল মল্লিক ভোটযুদ্ধে নেমেছেন। ৬ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মাহাফুজ হোসেন খানের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন হাবিবুর রহমান ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আহসানউল্লাহ হাসান সমর্থিত মোহাম্মদ রিপন।

একইভাবে ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দলসমর্থিত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দুলুর বিরুদ্ধে গোলাম রাব্বানী, ১৬ নম্বরে দলসমর্থিত হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে সেলিম আহমেদ রাজু, ২৩ নম্বরে দলসমর্থিত হেলাল কবিরের বিরুদ্ধে কামাল আহমেদ দুলু, ২৫ নম্বরে দলসমর্থিত সাইফুল ইসলাম কাজলের বিরুদ্ধে এসএম হাসেম, ৩০ নম্বরে দলসমর্থিত হাজি নাসির উদ্দীনের বিরুদ্ধে আবুল হাসেম, ৩১ নম্বরে দলসমর্থিত সাজেদুল হক খান রনির বিরুদ্ধে হাসিনা মোর্শেদ কাকলী ও ফরিদউদ্দিন ফরহাদ, ৩৮ নম্বরে দলসমর্থিত জাহাঙ্গীর মোল্লার বিরুদ্ধে আলী হোসেন, ৪০ নম্বরে দলসমর্থিত মোতালেব হোসেন রতনের বিরুদ্ধে আতাউর রহমান, ৪৩ নম্বরে দলসমর্থিত তহিরুল ইসলাম তুহিনের বিরুদ্ধে রেজাউল করিম এবং ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডে দলসমর্থিত মোতালেব হোসেন রতনের বিরুদ্ধে হেলাল তালুকদার বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন দুলু জানান, তার ওয়ার্ডে বিএনপির একজন নেতা প্রার্থী হিসেবে রয়ে গেলেও তাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। ওই প্রার্থী কোনো প্রচার চালাবেন না। ফলে তার কোনো সমস্যাও হবে না।

দক্ষিণে দলপ্রত্যাখ্যাত প্রার্থী যারা : ডিএসসিসির ৭৫টি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩টিতে রয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী। এর মধ্যে ১০ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি সমর্থিত হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন আনোয়ার হোসেন লিপু। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে দলসমর্থিত প্রার্থী আব্বাস উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন নজরুল ইসলাম জুয়েল।

একইভাবে ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে দলসমর্থিত শফিক উদ্দিন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে আবু নাছের লিটন, ৩৭ নম্বরে দলসমর্থিত ফরহাদ রানার বিরুদ্ধে সুমন ভূঁইয়া, ৩৯ নম্বরে দলসমর্থিত সাব্বির আহমেদ আরেফের বিরুদ্ধে মোজাম্মেল হক মুক্তা, ৪৬ নম্বরে দলসমর্থিত মো. ফারুকের বিরুদ্ধে মো. সোহেল ও ঢালী মামুনুর রশীদ, ৫০ নম্বরে দলসমর্থিত ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনোয়ার হোসেন স্বাধীন, ৫১ নম্বরে দলসমর্থিত আলিম আল বারী জুয়েলের বিরুদ্ধে কবির আহম্মেদ, ৫২ নম্বরে দলসমর্থিত রবিউল ইসলাম দীপুর বিরুদ্ধে বাদল রানা, ৫৫ নম্বরে দলসমর্থিত মো. সামিরের বিরুদ্ধে শহিদুল হক, ৫৯ নম্বরে দলসমর্থিত আসলাম মোল্লার বিরুদ্ধে খোরশেদ আলম খোকন, ৬১ নম্বরে দলসমর্থিত জুম্মন মিয়ার বিরুদ্ধে শাহ আলম এবং ৬৬ নম্বরে দলসমর্থিত আকবর হোসেন নান্টুর বিরুদ্ধে সাবেক কাউন্সিলর নুরুদ্দিন মিয়া বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন।

১০ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপিসমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী হারুন অর রশীদ জানান, একজন সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ ও সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণে তিনি এবারও দলের সমর্থন নিয়ে কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা তার বিরুদ্ধে একজন প্রার্থীকে দাঁড় করিয়েছেন। যাকে দাঁড় করানো হয়েছে, এলাকায় তার কোনো জনসমর্থনও নেই। রাজনীতিতেও নবীন তিনি। জনগণের বিপুল ভোটে তিনিই জিতবেন বলে মনে করেন হারুন।

উন্মুক্ত ওয়ার্ড একটি : ডিএনসিসির ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থিতা বিএনপির সব প্রার্থীর জন্য উম্মুক্ত রাখা হয়েছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন ওসমান গণি শাহজাহান ও মাসুদ খান রাজেশ।

এ প্রসঙ্গে মাসুদ খান রাজেশের দাবি, দলের প্রতিটি নেতাকর্মীই তার সঙ্গে রয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অন্য প্রার্থী ওসমান গনি শাহজাহান বিষয়টি মানতে না চাওয়ায় শেষ পর্যন্ত দলের শীর্ষ নেতারা ওয়ার্ডটিকে উন্মুক্ত রেখেছেন।

দুই ওয়ার্ডে কোনো প্রার্থী নেই : এদিকে ডিএসসিসির দুটি ওয়ার্ডে কোনো কাউন্সিলর প্রার্থী নেই বিএনপির। এর মধ্যে ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে হাজি আলতাফ হোসেনকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হয়। কিন্তু পরে আলতাফ হোসেনই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। ফলে ওয়ার্ডটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

এ ছাড়া ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি থেকে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল মোস্তাফিজুর রহমান ফয়েজকে। পরে তার মনোনয়ন বাতিল হয়। পরে আপিলের শুনানিতে অংশ নিতে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাওয়ার পথে তাকে অপহরণ করে নির্বাচনী যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বিএনপির। এই ওয়ার্ডেও অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

আরও পড়ুন

×