সিএনএনের বিশ্লেষণ
শান্তি প্রতিষ্ঠা যুদ্ধের মতোই কঠিন হবে
ফাইল ছবি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ০৩:৪৮
ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত সপ্তাহে ফ্রান্সে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা সমঝোতা স্মারকের মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের যুদ্ধ অবসান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলা ইত্যাদি নানা ইস্যুর স্থায়ী সমাধানের পথ খুলেছে। আবার তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত নানা জটিল সমস্যার এখনও পূর্ণাঙ্গ কোনো সমাধান আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জ্যেষ্ঠ জাতীয় সুরক্ষা কর্মকর্তা ফিলিপ গর্ডন গত রোববার বলেন, ‘ভালো সম্ভাবনা আছে যে, এই সমঝোতা টিকে যাবে, কারণ এটি দুই পক্ষের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত।’ এই সমঝোতার কারণে তেহরান তেল বিক্রি থেকে শত শত কোটি ডলার আয় করতে পারবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইরান মানবে কারণ এটির সঙ্গে তাদের স্বার্থ জড়িয়ে আছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এটি মানবে, কারণ তারা আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায় না।’
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী পক্ষ কাতার ও ইরান গত রোববার শেষ ভাগে জানায়, ইতিবাচক ও গঠনমূলক পরিবেশে আলোচনা হয়েছে এবং উৎসাহব্যাঞ্জক অগ্রগতি এসেছে। ৬০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপ তৈরি করেছে দুই পক্ষ। তবে এখনও অনেক কিছুই এ সমঝোতাকে ঝুঁকির মুখে রেখেছে। কৌশলগত চাপ ও নানা প্রতিবন্ধকতা শান্তির জন্য হুমকি তৈরি করছে।
ইসরায়েল ও লেবানন পরিস্থিতি পুরো প্রক্রিয়াটির কার্যকারিতাকেই হুমকির মুখে ফেলছে। ইরান বর্তমান বাস্তবতায় তাদের নতুন হাতিয়ার ব্যবহার করার চেষ্টা করছে এবং আলোচনার আগ দিয়ে হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট গত রোববার ইরানে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন। ফলে আলোচনাও যে খুব সরলরেখায় চলছে, বিষয়টি এমন নয়।
সমঝোতা স্মারক অনুসারে, ইরান অর্থনীতি পুনর্গঠনে ও যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠার জন্য তিনশ বিলিয়ন ডলার পাবে। এটি নিয়ে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট একাধিকবার বলেছেন, তারা দশ পয়সাও দেবেন না; বরং তিনি আভাস দিয়েছেন, ইরানের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এই অর্থ দিতে পারে। দিন শেষে এটি অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। এ ছাড়াও হইচই শুরু হয়েছে বিদেশের মাটিতে ইরানের জব্দ থাকা তহবিল ছাড় দেওয়ার শর্ত নিয়েও।
ওয়াশিংটন ট্রাম্পের চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সমঝোতা স্মারকে ইরান বেশি ছাড় পেয়েছে বলে সমালোচনা হচ্ছে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের দলের ভেতরেই। অনেকে আবার সন্দেহ পোষণ করছেন এর স্থায়ীত্ব নিয়ে। এসব ডামাডোলে ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের ‘ঐতিহাসিক জয়লাভের’ দাবি ফিকে হয়ে পড়েছে।
রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সমঝোতা নিয়ে খুব একটা আশাবাদী না হলেও ট্রাম্পের পন্থাকে সমর্থন করছেন। তিনি বলেন, ‘যদি আপনি সমঝোতা স্মারকের মধ্য দিয়ে কূটনৈতিক পথে হাঁটতে না পারেন, তাহলে আপনাকে হয় যুদ্ধে যেতে হবে, না হয় অন্য কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আসুন এটাকে সুযোগ দেই। আসুন কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করি।’ পাশাপাশি তিনি এটিও বলেন, ‘আমি মনে করি, এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে।’
অন্যদিকে নিউ জার্সির ডেমোক্র্যা ট সিনেটর করি বুকার ইরান চুক্তিকে ট্রাম্পের ‘সর্বনাশা ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছেন। তিনি মনে করছেন, এই সমঝোতা আত্মসমর্পণের শামিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসির মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘ইরান সব সুফল পাচ্ছে, আক্ষরিক অর্থেই শত শত কোটি ডলার পাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এখনও ক্ষতির মধ্যেই আছে। যুদ্ধে একশ বিলিয়ন ডলার খরচ করার কারণে নিজেদের জীবনযাত্রার খরচ আকাশচুম্বী হতে দেখছেন মার্কিনিরা।’
ট্রাম্পের লক্ষ্য ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরিয়ে আনা, দেশটির পরিশোধিত ইউরেনিয়াম ধ্বংস করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি পাল্টে দেওয়া। আপাতত লক্ষ্যগুলোকে দূরবর্তী উচ্চাকাঙ্ক্ষা বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, এ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে কৌশলগত বাধার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। তিনি এমন এক কৌশলগত চক্রে আটকে গেছেন, যার কোনো শেষ নেই। আর এই পুরোটার সূত্রপাত হয়েছে যুদ্ধ শুরু করার মধ্য দিয়ে। ফলে যুদ্ধ শুরু করে যে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, শান্তি প্রতিষ্ঠাতেও একই বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হবে তাদের। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। শান্তি প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে লক্ষ্য অর্জিত হয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
