নদীতে ফোন ফেলেও শেষ রক্ষা হলো না মাসুদের
সাভারে রিপন হত্যার নেপথ্যে স্ত্রীর শ্লীলতাহানির ক্ষোভ: পিবিআই
প্রতীকী ছবি
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ | ১২:১৪
ঢাকার সাভারের হরিণধরা এলাকায় পাশাপাশি বাসায় থাকতেন রিপন কাজী সরদার আর মো. মাসুদ ও রহিমা আক্তার প্রিয়া দম্পতি। প্রতিবেশী হওয়ায় তাদের মধ্যে ছিল সুসম্পর্ক। একদিন হঠাৎ রিপনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন রাতে তাঁকে খুঁজতে খুঁজতে মাসুদের বাসায় যান রিপনের স্ত্রী। তখন মাসুদ-প্রিয়ার অসংলগ্ন কথাবার্তায় সন্দেহ হয় তাঁর। একপর্যায়ে তাদের ঘরের তালা ভেঙে ভেতরে পাওয়া যায় রিপনের রক্তাক্ত লাশ।
প্রায় দুই বছর আগের এ ঘটনার তদন্তে মাসুদ ও প্রিয়ার সংশ্লিষ্টতা পায় পুলিশ। তদন্তসূত্র বলছে, ঘটনার রাতে মাসুদের অনুপস্থিতিতে তাঁর বাসায় যান রিপন কাজী। তখন তিনি প্রিয়াকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন। মাসুদ ফিরে এ দৃশ্য দেখতে পেয়ে রিপনকে কুপিয়ে হত্যা করেন। পরে তিনি পালানোর সময় নিজের মোবাইল ফোন থেকে কল করে পরিচিত কয়েকজনের সহায়তা চান। এরপর গ্রেপ্তার এড়াতে ফোনটি নদীতে ফেলে দেন। তবে তাতে রক্ষা পাননি তিনি। বরং যাদের সহায়তা চেয়েছিলেন, তারাই ডেকে নিয়ে মাসুদকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
সম্প্রতি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে। মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই ঢাকার এসআই মনজুর রহমান সমকালকে বলেন, ২০২৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে রিপন কাজীকে হত্যা করা হয়। পরদিন লাশ উদ্ধারের সময় প্রিয়া এবং পরে মাসুদকে আটক করা হয়। তারা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।
প্রিয়ার জবানবন্দির বরাত দিয়ে তদন্তসূত্র জানায়, বিয়ের পর থেকে প্রিয়া ও মাসুদ সাভারের জমজম সিটিতে থাকতেন। তাদের তিন বছরের একটি সন্তান রয়েছে। পরে তারা হরিণধরা এলাকায় এক কক্ষের বাসা ভাড়া নেন। সেখানে প্রতিবেশী রিপন কাজীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি ট্যানারির মালপত্র ট্রাকে লোড করার জন্য ‘চেইন কপ্পা’ সরবরাহ করতেন। পাশাপাশি তাঁর ইয়াবা কারবারও ছিল। তিনি ও প্রিয়ার স্বামী অনেক সময় ঘরে বসে ইয়াবা সেবন করতেন। ঘটনার রাতে মাসুদ বাসায় ছিলেন না। তাদের সন্তান দাদার বাড়িতে ছিল। এর মধ্যে প্রিয়ার বাসায় যান রিপন। তিনি প্রিয়াকে জিজ্ঞেস করেন, মাসুদ ইয়াবা খাবে কিনা? কথা বলতে বলতেই শ্লীলতাহানির চেষ্টা করলে মাসুদ ঘরে ঢুকে তা দেখে ফেলেন। তাঁকে দেখে রিপন বঁটি দিয়ে মাসুদের বুক, পিঠ ও মুখে কোপ দেন। তখন মাসুদ তাঁকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দেন। প্রিয়া রিপনের দুই পা চেপে ধরেন। আর মাসুদ বঁটি দিয়ে রিপনের গলা কেটে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে কুপিয়ে হত্যা করেন।
মাসুদ জবানবন্দিতেও প্রায় একই রকম বর্ণনা দেন। তাঁর ভাষ্য, রিপন কাজী প্রায়ই প্রিয়ার দিকে ‘খারাপ দৃষ্টিতে’ তাকাতেন। ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি সিগারেট কিনতে বের হয়েছিলেন। ফিরে এসে দেখেন, প্রিয়াকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করছেন রিপন। এরপর তিনি একাই রিপনকে হত্যা করেন। তারা সকালে খাটের পাশে লাশটি সরিয়ে রেখে ঘরে তালা দিয়ে মাসুদের মায়ের বাসায় চলে যান। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তারা একটি ড্রাম নিয়ে আবার ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু ড্রামের ভেতর লাশ ঢোকাতে পারেননি। পরে রিপনের স্ত্রী লাইজু লোকজন নিয়ে ঘরের তালা ভেঙে লাশ উদ্ধার করেন।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, রিপনের চতুর্থ স্ত্রী লাইজু। তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। আরেক নারীর সঙ্গে রিপনের সম্পর্ক নিয়ে হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহখানেক আগেও পারিবারিক সালিশ হয়।
- বিষয় :
- ঢাকা