ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রিভিউ

মাসুদ রানা কতটা স্পাই-থ্রিলার, কতটা ‘কমেডি’

মাসুদ রানা কতটা স্পাই-থ্রিলার, কতটা ‘কমেডি’
×

মাসুদ রানা সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে রাসেল রানা। ছবি: সংগৃহীত

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ | ১৫:২৯

রইদ, রকস্টার কিংবা বনলতা সেন নিয়ে নানামুখী আলোচনার বিপরীতে কিছুটা আড়ালে পড়েছে ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া আরেক সিনেমা ‘মাসুদ রানা’। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হলগুলোতে ঝড় তুলবে ‘গোয়েন্দাভিত্তিক অ্যাকশন সিনেমাটি’। 

কিন্তু শনিবার দুপুরে স্টার সিনেপ্লেক্সের ওয়েবসাইটে দেখাচ্ছিল, পান্থপথ, মহাখালী ও বিজয় সরণীর শাখাগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন অবিক্রিত। শুটিং শুরুর পর প্রায় ৫ বছর ধরে আলোচনায় থাকা সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত আসলে কেমন হলো? সে আগ্রহ থেকেই দেখতে গিয়েছিলাম সামরিক জাদুঘরের সিনেপ্লেক্সে। 

কোনো ভূমিকা ছাড়াই একটি ছোটখাটো সেনা অভিযানের মধ্য দিয়েই শুরু হলো গল্প। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের সেই দৃশ্য সিনেমার চরিত্রগুলো সম্পর্কে ইঙ্গিত দিলেও মূল গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নয়। তবে শুরুতেই দর্শকের মনোযোগ পর্দায় টেনে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। জেমস বন্ড কিংবা মিশন ইম্পসিবলের মতো গল্প বলার গতি মেনে শুরুতেই নায়ক মাসুদ রানাকে একটি অভিযানে পাঠানো হয়। ঢাকা থেকে দৃশ্য গড়ায় থাইল্যান্ডে।

তিন যুগের বেশি সময় ধরে জেমস বন্ড ও মিশন ইম্পসিবলের মতো সিরিজ চলচ্চিত্রগুলো স্পাই-থ্রিলারের একটি মানদণ্ড দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সেটি মাথায় রেখে মাসুদ রানা দেখতে বসলে শুরুর কয়েক মিনিট বেশ আশা জাগানিয়া। মাসুদের সঙ্গে দর্শকরা ঢাকা থেকে থাইল্যান্ড যাওয়ার পর পরিচিত হন কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র সোহানার সঙ্গে (পূজা চেরি)। যিনি ইউরেনিয়ামের একটি চালান নিতে আগে থেকে সেখানে আছেন। প্রত্যাশার পারদ উড়োজাহাজের মতো যতটা আকাশে উঠেছিল, সোহানার উপস্থিতিতে তা হঠাৎ করেই মাটিতে নেমে যায়।

পূজা চেরি, রাসেল রানা ও সৈয়দা তিথি। ছবি: সংগৃহীত

সিনেমার দৃশ্যে থাইল্যান্ডের অজ্ঞাত স্থানে দেখা যায়, সোহানার কাছে পানির বোতলের মতো দেখতে একটি পাত্রে করে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করা হচ্ছে। যা বাংলাদেশে নিয়ে বোমা তৈরি করা হবে। ইউরেনিয়ামের মতো পদার্থ এভাবে হস্তান্তরের দৃশ্য কেবল অযৌক্তিক কল্পনাতেই সম্ভব।  

চলচ্চিত্রের পোস্টারে লেখা ছিল, এটি কাজী আনোয়ার হোসেনের সৃষ্ট ‘স্পাই-থ্রিলার’ উপন্যাস (মাসুদ রানা সিরিজ) অবলম্বনে নির্মিত। তবে সিরিজের কোন পর্ব থেকে অনুপ্রাণিত তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। সিনেমায় তিনটি সমুদ্র বন্দরে বোমা বিস্ফোরণের ষড়যন্ত্র ও তা ঠেকিয়ে দেওয়া নিয়ে মাসুদ রানার অভিযান তুলে ধরা হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, চলচ্চিত্রটি ‘ধ্বংস পাহাড়’ বই থেকে অনুপ্রাণিত। মাসুদ রানা সিরিজেই প্রথম বই এটি। যেখানে পাকিস্তান আমলে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই বাঁধ ধ্বংসের জন্য বাঁধের তিনটি অংশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটনার ষড়যন্ত্র আছে।

মূল বইয়ে সোহানা চরিত্রটি নেই। সিনেমায় এটি যুক্ত করা হলেও প্রথম দুই থেকে তিনটি দৃশ্যের পর এ চরিত্রের তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা দেখা যায় না। মাসুদ রানার চরিত্রে রাসেল রানার উপস্থিতি বেশ মানানসই। কিন্তু এ চরিত্রটিকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। কারণ, বইয়ে যারা মাসুদ রানা পড়েছেন, তারা সচেতনভাবেই পর্দার মাসুদ রানার হাঁটাচলা, কথা বলার মধ্যে সেটির প্রতিফলন দেখতে চাইবেন। রাসেল রানাকে এ চরিত্রে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে খুঁটিনাটিতে বেশ ঘাটতি আছে।

মাসুদ রানা সিনেমার পোস্টার।

প্রথমত, মাসুদ রানা সাধারণ কোনো ব্যক্তি নন। তিনি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নেমেছেন। সুতরাং তাঁর মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে সবকিছুতেই নিরাপত্তা তদারকির বিষয় থাকবে। কিন্তু পর্দায় মাসুদ রানার মোবাইল ফোনে এমন কিছু অ্যাপ দেখা যায়, যেগুলো খুবই সাধারণ ব্যবহারকারীর ফোনেও থাকে। 

দ্বিতীয়ত, ফাইটিংয়ের কারণে পার্শ্বচরিত্রগুলোর শারীরিক আঘাতের চিহ্ন দৃশ্য বদলের সঙ্গে সঙ্গে মুছে যায়। কিন্তু মাসুদ রানার মুখের আঘাত প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই ছিল। আরেক দৃশ্যে তাঁকে ঢাকার আইসিটি টাওয়ার থেকে অপরাধীকে তাড়া করে দৌড়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকতে যেতে দেখা যায়। ছোটখাটো এমন আরও দৃশ্য আছে যেগুলো মাসুদ রানার চরিত্রকে হাস্যকরে পরিণত করে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রযোজক আবদুল আজিজ বলেছেন, ‘ছবি হিট হয় গল্প আর মেকিংয়ে, তারকাখ্যাতিতে নয়’। এ কথা সত্য যে, সিনেমাটিতে বড় কোনো তারকা নেই। কিন্তু নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিচালক সৈকত নাসির খুঁটিনাটি বিষয়গুলোতে কতটা মনোযোগ দিয়েছেন তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

একটি দৃশ্যে পরিচালক দেখিয়েছেন, পারমাণবিক বোমা তৈরি নিয়ে গবেষকরা এমন একটি ঘরে গবেষণা করছেন, যেখানে সাউন্ড সিস্টেম ও শুটিংয়ের সরঞ্জাম পরিবহনের বাক্সগুলো দেখা যাচ্ছে। সেই ঘরে আবার খলচরিত্র অমিত হাসানের সঙ্গে মারামারি করছেন মাসুদ রানা ও অন্য পার্শ্বচরিত্ররা। আরেকটি দৃশ্যে জুড়ে দেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার করা পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়ের’ কিছু ছবি।

গোয়েন্দা উপন্যাস নির্ভর সিনেমায় গোয়েন্দাগিরি কম। ছবি: সংগৃহীত

যেহেতু পারমাণবিক বোমা দিয়ে তিনটি সমুদ্র বন্দর উড়িয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রই গল্পের মূল বিষয়, সুতরাং সেখানে এমন গোজামিল খুবই দৃষ্টিকটু লাগে। যেমন দৃষ্টিকটু লেগেছে, অ্যাকশন দৃশ্যের পর জুড়ে দেওয়া গান। রক্তাক্ত অবস্থায় অচেতন হয়ে থাকা এক এজেন্ট (সৈয়দা তিথি) হঠাৎ করে সজাগ হয়ে মাসুদ রানার সঙ্গে নাচে অংশ নেন। সারা দেশে প্রতিভা অন্বেষণের মাধ্যমে নির্বাচন করা রাসেল রানার নাচের দৃশ্য সিনেমা হলে অনেকটাই হাসির খোরাক হলো। স্পাই-থ্রিলার ধাঁচের সিনেমাটিও যেন বৃহৎ অংশে হাসিরই একটি চলচ্চিত্র।

আরও পড়ুন

×