স্তন ক্যান্সার: ঝুঁকি ও উপসর্গ
ডা. মুনতাসির ফয়সাল
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশে নারীর মধ্যে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের হার শীর্ষে। সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে প্রাথমিক লক্ষণগুলো গোপন রাখার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে বেশির ভাগ রোগী একেবারে শেষ পর্যায়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। স্তন ক্যান্সারে শুধু নারী নন, পুরুষও আক্রান্ত হতে পারেন। তবে নারীর ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশ্বে প্রতি আটজনের মধ্যে একজন নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। স্তনের কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে অতিরিক্ত কোষগুলোর বিভাজনের মাধ্যমে টিউমার বা পিণ্ডে পরিণত হয়। রক্তনালি, লসিকা ও অন্যান্য মাধ্যমের সাহায্যে এটি শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাকে ক্যান্সার বলা হয়। যে কোনো নারীই স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন। স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে দ্রুত শনাক্ত করা গেলে পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব। এ কারণে চিকিৎসকরা ২০ বছর বয়স থেকে বাড়িতে বসে নিয়মিত নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা (Breast Self-Examination-BSE) করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে যারা
পারিবারিক ইতিহাসে পরিবারের মায়ের দিকের নিকটাত্মীয় কারও স্তন ক্যান্সার হয়ে থাকলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
মাসিক চক্র: ১২ বছর বয়সের পর মাসিক শুরু হলে এবং ৫৫ বছর বয়সের পরও মেনোপজ না হলে অর্থাৎ দেরিতে মেনোপজ হলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
হরমোন থেরাপি: পোস্টমেনোপোজাল সিনড্রোমের চিকিৎসা হিসেবে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি (HRT) নিলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
প্রজনন ও জীবনধারা: ৩০ বছরের বেশি বয়সে প্রথমবার গর্ভধারণ, শিশুকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, জিনগত মিউটেশনও স্তন ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চা না করা, স্থূলতা (Obesity), ধূমপান ও মদ্যপান স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বয়স: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়তে থাকে।
নারীরা প্রতি মাসে একবার মাসিক শেষ হওয়ার পঞ্চম অথবা সপ্তম দিনে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অথবা গোসলের সময় স্তন এবং বগলের নিচের অংশ পরীক্ষা করতে পারেন।
স্তন ক্যান্সারের উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে
চাকা বা পিণ্ড: স্তনের চারদিকে, বগলের ভেতর বা আশপাশে কোনো স্থান ফুলে ওঠা কিংবা আলতো করে ছুঁয়ে দেখলে কোনো শক্ত চাকার মতো অনুভব হওয়া।
ত্বকের পরিবর্তন: স্তনের কোনো অংশ ফোলা বা ব্যথা হওয়া, স্তনের চামড়া কুঁচকে যাওয়া বা স্তনের চামড়ার রং বা আকৃতিতে পরিবর্তন হওয়া।
আকৃতির পার্থক্য: দুই স্তনের আকারে পরিবর্তন হওয়া।
লালচে ভাব: স্তনের আশপাশে লাল হয়ে যাওয়া।
স্তনের বোঁটার পরিবর্তন: স্তনের বোঁটা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা স্তনের বোঁটা দিয়ে অস্বাভাবিক রস বের হওয়া।
এর মধ্যে এক বা একাধিক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
স্তন ক্যান্সার নির্ণয় ও চিকিৎসা
স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ে মূলত তিনটি পদ্ধতি আছে–
ম্যামোগ্রাম: এটি বিশেষ ধরনের এক্স-রে, যার সাহায্যে স্তনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন ধরা পড়ে। ৪০ বছর বয়স থেকে বছরে একবার ম্যামোগ্রাম করা উচিত। ম্যামোগ্রামের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সার নির্ণয় করা সম্ভব।
বায়োপসি ও এফএনএসি: ক্যান্সার যদি ম্যামোগ্রামে ধরা পড়ে, তবে নিশ্চিত হওয়ার স্বার্থে বায়োপসি (টিস্যুর নমুনা পরীক্ষা) ও এফএনএসি (সূক্ষ্ম সুঁই ব্যবহার করে কোষের নমুনা পরীক্ষা) এই দুটো টেস্ট করা হয়।
চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা: স্তনে পিণ্ড আছে কিনা তা চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো। তবে স্তনে সমস্যা হওয়া মানেই কিন্তু ক্যান্সার নয়, পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়েছে কিনা তা জানার জন্য সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা বোন স্ক্যানিংও করা হয়।
ক্যান্সারের চিকিৎসা বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন ক্যান্সারের ধরন ও আকার, ক্যান্সার স্তনে সীমাবদ্ধ আছে নাকি ছড়িয়ে পড়েছে ইত্যাদির ওপর।
স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধের নতুন তথ্য
স্তন ক্যান্সাবের ঝুঁকি কমাতে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক সক্রিয়তা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের বা ৭৫ মিনিট উচ্চ মানের শরীরচর্চা করা উচিত। খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্যদানা অন্তর্ভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। এ ধরনের খাদ্যে চর্বির পরিমাণ কম এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি থাকে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এটি পরিহার বা সীমিত করা উচিত।
জন্মনিয়ন্ত্রক বড়ি বা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে ঝুঁকির মাত্রা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা নারীর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিরোধমূলক ওষুধ গ্রহণের সুযোগ থাকে। যেমন ট্যামোক্সিফেন। স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার জন্য নিয়মিত ম্যামোগ্রামের পাশাপাশি ক্লিনিক্যাল ব্রেস্ট এক্সামিনেশন বা চিকিৎসকের মাধ্যমে স্তন পরীক্ষা করানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা নারীর জন্য ম্যামোগ্রামের পাশাপাশি এমআরআই স্ক্রিনিংয়েরও প্রয়োজন হতে পারে। সচেতনতা ও নিয়মিত স্ক্রিনিংই হলো এই রোগ মোকাবিলায় প্রধান হাতিয়ার।
[সহযোগী অধ্যাপক (সার্জারি) পপুলার মেডিকেল কলেজ]
- বিষয় :
- স্তন ক্যান্সার
