উপদ্রুত অঞ্চলে প্রসূতি মায়ের সমস্যা
ডা. সুলতানা আফরোজ (শিলা)
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বন্যা উপদ্রুত এলাকায় প্রসূতি মা বিশেষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। পানিবাহিত রোগ, পুষ্টিহীনতা, চিকিৎসাসেবায় বাধা ও মানসিক চাপ তাদের জীবন তো বটেই অনাগত শিশুর জীবনও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কার্যকরী ভূমিকা প্রসূতি মায়ের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পানিবাহিত রোগ ছাড়াও অন্যান্য সংক্রামিত রোগ যেমন টাইফয়েড, ভাইরাল হেপাটাইটিস, চর্মরোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে প্রসূতি মায়েদের আশ্রয়কেন্দ্রের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তর করতে হবে।
নিরাপত্তা ও আশ্রয়জনিত সমস্যা
আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানাভাব, গোপনীয়তা ও পরিচ্ছন্নতার অভাবে প্রসূতি মা কষ্টে পড়েন। প্রসূতির প্রসবের জন্য আগাম প্রস্তুতি হিসেবে
প্রসবোত্তর মাকে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে; প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ওষুধ, খাবার স্যালাইন, জিঙ্ক, স্যাভলন, ব্যান্ডেজ, টর্চ, মোমবাতি প্রস্তুত রাখুন।
বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা
খাবার ফোটানো বা জীবাণুমুক্ত পানি পান ও রান্নায় ব্যবহার করুন। ডায়রিয়া চিকিৎসার জন্য খাবার স্যালাইন, জিঙ্ক ট্যাবলেট, ভিটামিন এ ক্যাপসুল দিন। পরিচ্ছন্ন হাত ধোয়ার জন্য সাবান অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড, পরিষ্কার কাপড়, শুকনো বিছানা; প্রসবোত্তর মায়ের বিশ্রামব্যবস্থা, নবজাতক শিশুর জন্য কাথা বা তুলাসহ নির্মল ও যতটা সম্ভব পরিচ্ছন্ন পরিবেশের ব্যবস্থা রাখতে হবে ।
জরুরি প্রসব পরিকল্পনা
প্রসব বেদনা শুরু হলে দ্রুত ফায়ার সার্ভিস বা স্থানীয় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চিত করাসহ স্ট্রেচার বা ভেলা ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যবহারে নিরাপদ স্থানে নিয়ে হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা
উপদ্রুত অঞ্চলে সহজলভ্য খাবার চিড়া, মুড়ি, গুড়া দুধ, গুড়, তরল দুধ, ডাল, শাক-সবজি, সংরক্ষণযোগ্য ফলফলাদির সরবরাহের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অন্তঃসত্তা বা প্রসূতি মায়ের জন্য সংরক্ষণযোগ্য অতিরিক্ত খাদ্য (প্রোটিন সমৃদ্ধ- ডাল, তেল, গুড়া দুধ) খাবারের ব্যবস্থা সরবরাহ, সরকারি এবং ত্রাণব্যবস্থার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে।
প্রসূতি মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় নজর দেওয়া
বন্যার ব্যাপকতা, পারিবারিক বিপর্যয়, সম্পদহানি ও অনিশ্চিত জীবন গর্ভকালীন উচ্চচাপসহ গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে চিকিৎসকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এক্ষেত্রে পরিবারসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের সহমর্মিতা এবং আশ্বাস প্রসূতি মায়ের মনকে উদ্দীপ্ত রাখতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে। এজন্য আশ্রয়কেন্দ্রে শান্ত পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি এবং প্রয়োজনে প্রসূতি মায়ের কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থার উদ্যোগ সামাজিক সংস্থাগুলোকে নিতে হবে।
ভ্রাম্যমাণ মাতৃস্বাস্থ্য টিম
গর্ভবতী মা শনাক্তকরণসহ প্রসবপূর্ব এবং প্রসবোত্তর স্বাস্থসেবার অংশ হিসেবে টিটেনাস টিকা, আয়রন-ফলিক এসিড সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
জরুরি প্রসব ব্যবস্থার আয়োজন
আশ্রয়কেন্দ্রে ডেলিভারির জন্য ব্যবহৃত স্টেরাইল বা জীবাণুমুক্ত সামগ্রী, প্রসবের সময় ব্যবহারযোগ্য অক্সিটোসিন বা ম্যাগনেসিয়াম সালফেটের মতো জরুরি ওষুধ, নরমাল এবং ডেক্সট্রোজ স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
পানি স্যানিটেশন
বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা সম্ভব না হলে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ফিটকিরি ইত্যাদির সরবরাহ নিশ্চিত করা। সর্বোপরি উপদ্রুত এলাকায় সম্ভব হলে পানি ফুটিয়ে তা পান করার ব্যাপারে স্বাস্থ্যকর্মীরা বানবাসী মানুষকে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করবেন। অস্থায়ী টয়লেট ও হাত ধোয়ার জায়গার ব্যবস্থা গড়ে তোলা, টিউবওয়েলের মুখ পলিথিন দিয়ে বন্ধ করে রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন–রোগ সংক্রমণ কমাতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রসূতি মায়ের চিকিৎসা নিরাপত্তা
আশ্রয়কেন্দ্রে নারী-শিশুর সুরক্ষাসহ নবজাতকের মাতৃদুগ্ধ পানের সুব্যবস্থা, নবজাতকের যত্নে ক্যাঙ্গারু মা পদ্ধতিতে শিশুপালন, পর্যাপ্ত আলো, পৃথক শৌচাগার ও নিরাপদ বিশ্রামের জায়গার সুনিশ্চিত করতে হবে।
[ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি ও অবস বিভাগ]
- বিষয় :
- ডাক্তার