নাকের হাড় বেঁকে গেলে কী করবেন
ছবিটি জেমিনি এআই দিয়ে তৈরি
ডা. মো. আব্দুল হাফিজ
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নাকের হাড় বাঁকা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডেভিয়েটেড নেসাল সেপ্টাম’ (DNS) হলো একটি অত্যন্ত সাধারণ শারীরিক জটিলতা। মানুষের নাকের মাঝখানের যে পাতলা হাড় ও তরুণাস্থির দেয়াল থাকে, তাকে সেপ্টাম বলা হয়। মূলত এই দেয়ালটি বাঁকা হয়ে গেলেই নাকের একদিকের পথ সরু হয়ে যায় এবং অন্যদিকটি প্রশস্ত হতে পারে, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের নাকের মাঝখানের এই হাড় কিছুটা বাঁকা থাকে। অনেকের ক্ষেত্রে এটি জন্মগত ত্রুটি হিসেবে পরিলক্ষিত হয়, আবার অনেকের জীবনের কোনো এক পর্যায়ে দুর্ঘটনায় নাকে আঘাত পাওয়ার ফলে হাড় বেঁকে যেতে পারে।
সাধারণত, যদি হাড়ের এই বাঁকা অবস্থাটি মৃদু হয় এবং কোনো শারীরিক উপসর্গ দেখা না দেয়, তবে ভয়ের কিছু নেই। এটি অনেকের ক্ষেত্রে একেবারেই টের পাওয়া যায় না এবং এতে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। অর্থাৎ, হাড় সামান্য বাঁকা থাকলেই যে অস্ত্রোপচারের টেবিলে যেতে হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি তখন পর্যন্তই স্বাভাবিক, যতক্ষণ না তা রোগীর জীবনমানের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তবে জটিলতা বাড়ে তখনই, যখন এই বাঁকা হাড়ের কারণে নাকের অভ্যন্তরীণ বায়ু চলাচলের পথ গুরুতরভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদি নাক বন্ধ থাকা, অসহ্য মাথাব্যথা, ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা, ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়া এবং বারবার সাইনোসাইটিসের মতো কষ্টকর সমস্যার উদ্ভব হয়। এমনকি অনেক সময় এটি থেকে মুখগহ্বরে অস্বস্তি বা দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টও দেখা দিতে পারে। যখন এই সমস্যাগুলো একজন ব্যক্তির নিয়মিত স্বাভাবিক জীবনযাপনকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন অবহেলা না করে অবশ্যই একজন নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য।
সময়মতো সঠিক রোগ নির্ণয় এবং বিশেষজ্ঞের নির্দেশিত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করলে এই জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
অপারেশনের পর নাক বন্ধ কেন লাগে?
অপারেশনের পরপরই অনেক রোগী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে, নাক খোলার জন্যই তো অপারেশন করালাম, তবুও কেন বন্ধ লাগছে? এটি মূলত একটি স্বাভাবিক ও সাময়িক প্রক্রিয়া।
এর কয়েকটি কারণ
প্রদাহজনিত ফোলা ভাব:
অস্ত্রোপচারের প্রতিক্রিয়ায় নাকের ভেতরে টিস্যু ফুলে যায়, ফলে বাতাস চলাচলের পথ সাময়িকভাবে সংকুচিত থাকে।
রক্ত ও শ্লেষ্মা:
অপারেশনের স্থানে সামান্য রক্তক্ষরণ বা অতিরিক্ত শ্লেষ্মা জমে পথটি আংশিক বন্ধ
হতে পারে।
ক্রাস্টিং:
নাকের ভেতরের শুষ্ক অংশ বা শুকিয়ে যাওয়া রক্ত জমে শক্ত খোসার মতো তৈরি হয়, যা অস্বস্তি বাড়ায়।
সংক্রমণ:
খুবই বিরল ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের স্থানে সংক্রমণ হলে নাক বন্ধ হতে পারে, যার সঙ্গে জ্বর বা দুর্গন্ধযুক্ত সর্দি থাকতে পারে। এমন হলে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া আবশ্যক।
অপারেশনের পর করণীয়
দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করতে নিচের বিষয়গুলো মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
নিয়মিত ওষুধ সেবন:
সার্জনের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যথানাশক বা নাসল স্প্রে ব্যবহার করুন।
নাসল ডুসিং :
চিকিৎসকের পরামর্শমতো নরমাল স্যালাইন দিয়ে নাক পরিষ্কার রাখুন। এটি রক্ত জমাট বাঁধা বা শক্ত শ্লেষ্মা নরম করে বের করে দিতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সতর্কতা ও বিশ্রাম:
অপারেশনের পর অন্তত দুই সপ্তাহ ভারী কোনো কাজ, নিচু হয়ে কিছু তোলা বা মোটরসাইকেল চালানো থেকে বিরত থাকুন। নাকে যেন কোনোভাবেই আঘাত না লাগে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
শোয়ার ভঙ্গি:
ঘুমের সময় মাথার নিচে অতিরিক্ত বালিশ দিয়ে মাথা কিছুটা উঁচু করে শোয়ার চেষ্টা করুন, এতে ফোলা ভাব দ্রুত কমবে। গোসলের সময়ও সাবধানতা অবলম্বন করুন।
ফলোআপ ও সতর্কতা
সাধারণত অপারেশনের এক সপ্তাহ পর প্রথম ফলোআপ ভিজিট হয়। এ সময় সার্জন নাকের ভেতরের স্প্লিন্ট বা প্যাক খুলে দেবেন এবং নাক পরিষ্কার করে দেবেন। অপারেশনের পর চিকিৎসকের নির্দেশিত উপায়ে নিয়মিত নাক পরিষ্কার করা (Nasal douching) সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
অপারেশন-পরবর্তী নাক বন্ধের সমস্যাটি সাময়িক, যা কয়েক সপ্তাহেই স্বাভাবিক হয়ে যায়। তবে তীব্র মাথাব্যথা, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ বা দৃষ্টিশক্তির কোনো পরিবর্তনের মতো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত আপনার সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ধৈর্য ধরে চিকিৎসকের পরামর্শ ও নিয়মগুলো মেনে চললে আপনি দ্রুতই স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরে আসতে পারবেন।
[আবাসিক সার্জন (ই.এন.টি), সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল]
- বিষয় :
- চিকিৎসা