বয়স বাড়ছে, প্রয়োজন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ছবিটি জেমিনি এআই দিয়ে তৈরি
ডা. এ. হাসনাত শাহীন
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে রোগ শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে সহজেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব এবং অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করা যায়। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মিত করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে স্বাভাবিকভাবেই নানা ধরনের পরিবর্তন আসে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা কমে যায়, বিপাকক্রিয়ার গতি পরিবর্তিত হয় এবং বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। উদ্বেগের বিষয় হলো, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদরোগ কিংবা কিছু ধরনের ক্যান্সারের মতো অনেক রোগই প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। ফলে অধিকাংশ মানুষ রোগ জটিল আকার ধারণ করার পর চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। অথচ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং টেস্টের মাধ্যমে রোগ শুরুতেই শনাক্ত করা গেলে সহজেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব এবং অনেক ক্ষেত্রেই গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করা যায়। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মিত করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তের শর্করা পরীক্ষা
রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে গেলে ডায়াবেটিস হয়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল, চোখের রেটিনার ক্ষতি, স্নায়ুর সমস্যা এবং পায়ের জটিল সংক্রমণের মতো গুরুতর সমস্যার কারণ হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত অনেক মানুষই দীর্ঘদিন বুঝতে পারেন না যে তারা এ রোগে ভুগছেন। তাই ৪০ বছর বয়সের পর অন্তত বছরে একবার রক্তের শর্করা পরীক্ষা করা উচিত। যাদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, ওজন বেশি বা শারীরিক পরিশ্রম কম, তাদের আরও আগে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
লিপিড প্রোফাইল
রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে গেলে ধমনিতে চর্বি জমতে শুরু করে। এতে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। তাই ৩৫ বছর বয়সের পর বছরে অন্তত একবার লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানো উচিত। যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা বা হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরও নিয়মিত এই পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
রক্তচাপ পরীক্ষা
উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই দীর্ঘদিন শরীরের ক্ষতি করে। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, হৃদ্যন্ত্রের অকার্যকারিতা, কিডনি রোগ এবং চোখের রক্তনালির ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চোখের পরীক্ষা
চল্লিশ বছর পার হওয়ার পর চোখে ছানি, গ্লুকোমা, ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথি ও বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে গ্লুকোমা প্রাথমিক অবস্থায় কোনো লক্ষণ ছাড়াই দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করতে পারে। তাই বছরে অন্তত একবার চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে চোখ পরীক্ষা করানো উচিত। যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের আরও নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে পারে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে ক্রিয়েটিনিন, ইউরিয়া এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা করলে কিডনির সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব। এতে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করে কিডনি বিকলের ঝুঁকি কমানো যায়।
ক্যান্সার স্ক্রিনিং
অনেক ধরনের ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। তাই বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী ক্যান্সার স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোলোরেক্টাল ক্যান্সার শনাক্তে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মলের অকাল্ট ব্লাড টেস্ট, সিগময়েডোস্কোপি বা কোলনোস্কোপি করা যেতে পারে। নারীর জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে নিয়মিত প্যাপ স্মিয়ার এবং বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী ম্যামোগ্রাম করানো উচিত। স্তনে কোনো চাকা, ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা দীর্ঘদিনের কোনো ক্ষত অবহেলা করা যাবে না। যাদের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রোস্টেট ক্যান্সারসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্ক্রিনিং পরীক্ষা করাতে পারেন।
হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ঘনত্ব কমে গিয়ে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। এতে সামান্য আঘাতেও হাড় ভেঙে যেতে পারে। সাধারণত ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের এবং ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী পুরুষদের বিএমডি পরীক্ষার মাধ্যমে হাড়ের ঘনত্ব পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে যাদের দীর্ঘদিন স্টেরয়েড সেবনের ইতিহাস, অপুষ্টি বা হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক আরও আগে এই পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।
থাইরয়েড পরীক্ষা
অনেকের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। এতে ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন, কোষ্ঠকাঠিন্য, হৃদস্পন্দনের সমস্যা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী থাইরয়েডের পরীক্ষা করানো উচিত।
বয়স বাড়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, তবে সুস্থভাবে বার্ধক্যে পৌঁছানো অনেকটাই নির্ভর করে সচেতনতার ওপর। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম, ধূমপান ও তামাক বর্জন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা সম্ভব। তাই অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা না করে বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং টেস্ট করান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। সময়মতো রোগ শনাক্ত হলে অধিকাংশ জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব ।
[কনসালট্যান্ট, ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, ইমপালস হাসপাতাল, তেজগাঁও, ঢাকা]
- বিষয় :
- স্বাস্থ্য পরীক্ষা