বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্যঝুঁকি ও করণীয়
ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বন্যার সময় ও বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নিচে বন্যার ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও তা প্রতিরোধের উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
বন্যার সময় যেসব রোগ হতে পারে
ডায়রিয়া: বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং পচাবাসি খাবার খাওয়ার ফলে ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। এটি শিশু ও বয়স্কদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। দ্রুত খাবার স্যালাইন ও প্রয়োজনে শিরাপথে স্যালাইন দিতে না পারলে রোগী তীব্র পানিশূন্যতায় মারা যেতে পারে।
কলেরা: দূষিত পানি ও পচাবাসি খাবারের মাধ্যমে কলেরার জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে। এতে তীব্র ডায়রিয়া ও বমি হয়। দ্রুত চিকিৎসা না নিলে কলেরার কারণে জীবন সংকটাপন্ন হতে পারে।
জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই): দূষিত পানির মাধ্যমে এ ভাইরাসগুলো শরীরে প্রবেশ করে যকৃৎ বা লিভারকে আক্রান্ত করে। যদিও এগুলো সবসময় প্রাণঘাতী নয়, তবে শরীরে ব্যাপক দুর্বলতা তৈরি করে।
টাইফয়েড: দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে এই জীবাণু ছড়ায়। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, মাথাব্যথা এবং পেটের সমস্যা দেখা দেয়।
জিয়ারডিয়াসিস: বন্যার সময় পানিবাহিত এই রোগের কারণে পেটের পীড়া এবং আমাশয়ের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ত্বকের সংক্রমণ ও চর্মরোগ: বন্যার পানিতে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করলে পায়ে ফোসকা পড়া, খোসপাঁচড়া এবং বিভিন্ন ধরনের ফাংগাল ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা: ভেজা ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় সর্দি, কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কিওলাইটিসের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
মশাবাহিত রোগ: পানি জমে থাকা স্থানে মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটায়।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা: ঘরবাড়ি হারানো, খাদ্য সংকট ও অনিশ্চয়তার কারণে মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রতিরোধে করণীয়
বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা
বন্যার সময় বিশুদ্ধ পানির সংকট সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে পান করা উত্তম।
খাওয়ার পানি বিশুদ্ধ করতে ক্লোরিন ট্যাবলেট ব্যবহার করা যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, তিন পাল্লার ভাঁজ করা পরিষ্কার সুতির কাপড়ে পানি ছেঁকে পান করলে কলেরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
নলকূপের মাথায় পলিথিন দিয়ে ভালোমতো বেঁধে রাখতে হবে যেন বন্যার দূষিত পানি পাইপের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতা
খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে।
খাবার সবসময় ঢেকে রাখতে হবে এবং পচাবাসি খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
বন্যার পানির সংস্পর্শ যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। যদি একান্তই পানিতে নামতে হয়, তবে পায়ে পলিথিন জড়িয়ে বা পানিরোধক জুতা ব্যবহার করতে হবে।
মশা থেকে সতর্ক থাকা
দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করতে হবে।
ফুলের টব, বালতি, টায়ার বা অন্য কোনো পাত্রে পানি জমতে দেওয়া যাবে না।
খাবার ও পুষ্টি
ত্রাণে শুকনো ও পুষ্টিকর খাবার যেমন–চিড়া, মুড়ি, ছাতু, ডাল ভাজা, গুড়, গুঁড়া দুধ ও আমসত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পানিশূন্যতা রোধে নিয়মিত পানি পান করতে হবে।
প্রাথমিক চিকিৎসা কিট
বন্যা চলাকালীন একটি প্রাথমিক চিকিৎসা কিট প্রস্তুত রাখা জরুরি। এতে ব্যান্ডেজ, গজ, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম, প্যারাসিটামল ও ওআরএস থাকা প্রয়োজন।
সতর্কতা:
যে কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে বিলম্ব না করে স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা মা, শিশু এবং নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা উঁচু নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করতে হবে।
[বিভাগীয় প্রধান, শিশু হৃদরোগ বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল]
- বিষয় :
- বন্যা