দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অবসন্নতার কারণ
ডা. মো. আব্দুল হাফিজ শাফী
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
শরীর দুর্বলতা বা ক্লান্তি বলতে এমন অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে কাজে উদ্দীপনা পান না। অনেকে বলেন, শরীর ম্যাজ ম্যাজ করছে, কাজে মন বসছে না, অতিরিক্ত ঘুম পাচ্ছে কিংবা সারাদিন একধরনের আলসেমি বা অবসন্নতা ঘিরে থাকছে
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় শরীর দুর্বলতা বা ক্লান্তি বলতে এমন একটি অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একজন ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে কোনো কাজে উদ্দীপনা পান না। অনেক সময় রোগী চেম্বারে এসে অভিযোগ করেন যে, তাদের শরীর ম্যাজ ম্যাজ করছে, কাজে মন বসছে না, অতিরিক্ত ঘুম পাচ্ছে কিংবা সারাদিন একধরনের আলসেমি বা অবসন্নতা ঘিরে থাকছে। এই ধরনের ক্লান্তিবোধের পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু স্বাস্থ্যগত কারণ থাকতে পারে। নিচে শরীরের দুর্বলতা বা ক্লান্তির প্রধান কারণগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
প্রথমত, পানিশূন্যতা বা শরীরে লবণের ভারসাম্যহীনতা ক্লান্তির একটি বড় উৎস। শরীর শীতল রাখতে এবং বিপাকীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পানির কোনো বিকল্প নেই। শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করার পাশাপাশি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজ করলেও শরীর থেকে পানি বেরিয়ে যায়। প্রতিদিন অন্তত ১০ থেকে ১২ গ্লাস পানি পান করা জরুরি। পিপাসা পাওয়া মানেই শরীরে পানির অভাব, তাই তৃষ্ণার জন্য অপেক্ষা না করে নিয়মিত বিরতিতে পানি পান করা উচিত। ডায়রিয়া বা বমির মতো সমস্যা থেকে সুস্থ হওয়ার পর অনেকেই পর্যাপ্ত পানি ও স্যালাইন গ্রহণ করেন না, যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি থেকে যায়।
দ্বিতীয়ত, ঘুমের অনিয়ম এবং স্লিপ অ্যাপনিয়া ক্লান্তির অন্যতম কারণ। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের রাতে অন্তত সাত থেকে আট ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের প্রয়োজন। ঘুমের পরিবেশ শান্ত ও অন্ধকার থাকা জরুরি। অনেকে নাক ডাকার কারণে পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে বলে মনে করেন, কিন্তু ঘুমের মধ্যে সাময়িক শ্বাসরোধ হওয়া বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে শরীরের বিশ্রাম ব্যাহত হয়। এর ফলে ঘুম হলেও শরীরে ক্লান্তি রয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও দুর্বল করে দেয়, যা মানুষকে বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তৃতীয়ত, রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া নারীর ক্লান্তির একটি প্রধান কারণ। বিশেষ করে মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে যায়। যেহেতু হিমোগ্লোবিন কোষগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ করে, তাই এর অভাবে শরীর দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠে। খাদ্যাভ্যাসে কচুশাক, লালশাক ও কলিজা রাখার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ সেবন রক্তস্বল্পতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া শরীরের অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ বা আলসারের মতো রোগও রক্তস্বল্পতার কারণ হতে পারে, যা অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
চতুর্থত, থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোন নিঃসরণ কমে গেলে অর্থাৎ হাইপোথাইরয়েডিজম হলে বিপাক প্রক্রিয়া মন্থর হয়ে যায়। গলার সামনের দিকে অবস্থিত এই গ্রন্থিটি শরীরের এনার্জি লেভেল নিয়ন্ত্রণ করে। হরমোনের অভাবে শরীর দ্রুত ওজন বৃদ্ধি, ত্বক শুষ্ক হওয়া এবং প্রচণ্ড অলসতা অনুভব করে। পঞ্চমত, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসও অবসন্নতার অন্যতম কারণ। ইনসুলিনের অভাবে রক্তে সুগার বা গ্লুকোজ বেড়ে গেলেও তা কোষে প্রবেশ করে শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে না। ফলে শরীর কোষের ভেতরে পুষ্টিহীনতায় ভোগে এবং মানুষ শক্তিহীন হয়ে পড়ে। ঘন ঘন প্রস্রাব এবং অতিরিক্ত পিপাসা ডায়াবেটিসের এই ক্লান্তির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
ষষ্ঠত, হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় হাঁপিয়ে ওঠা বা সামান্য পরিশ্রমে বুক ধড়ফড় করা হৃদযন্ত্রের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। অনেক সময় হার্টের পেশিতে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছাতে না পারার কারণে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে কোনোভাবেই অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক। হার্টের ইসিজি বা প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে ক্লান্তিটা হার্টজনিত কিনা তা নিশ্চিত হওয়া দরকার।
সপ্তমত, অপরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস বা দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে গ্লুকোজ কমে গিয়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হতে পারে, যা শরীরের জ্বালানি কমিয়ে দেয়। সকালে নাশতা বাদ দেওয়া এবং সুষম খাবারের অভাব ক্লান্তি বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকলে শরীর গ্লুকোজের অভাবজনিত চাপের মুখে পড়ে, যা মেজাজ খিটখিটে করে তোলে এবং কাজের মনোযোগ নষ্ট করে। এছাড়া শরীরে ভিটামিন ডি এবং বি-১২-এর অভাবও ক্লান্তির কারণ হতে পারে, যা নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত করা সম্ভব।
অষ্টমত, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রভাবকেও অবহেলা করার উপায় নেই। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা ডিপ্রেশন মানুষকে শারীরিক ক্লান্তির দিকে ঠেলে দেয়। মনের ওপর চাপ থাকলে শরীর তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। অনেক সময় কোনো শারীরিক রোগ পাওয়া না গেলেও শুধু মানসিক ক্লান্তি থেকেই মানুষ বিছানা থেকে উঠতে চায় না।
ক্লান্তির চিকিৎসা করার আগে এর অন্তর্নিহিত কারণ নির্ণয় করা অত্যন্ত জরুরি। ক্লান্তি কোনো রোগের নাম নয়, বরং এটি শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার সংকেত মাত্র। সঠিক কারণ জানা গেলে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা সহজ হয়। পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই পারে এই ক্লান্তি দূর করে আপনাকে সতেজ ও কর্মক্ষম রাখতে।
[লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]
- বিষয় :
- চিকিৎসা
