তীব্র গরমে সুস্থ থাকতে কী করবেন
ছবিটি জেমিনি এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে
ডা. আবদুল্লাহ শাহরিয়ার
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ | ০৭:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
তীব্র গরমের সময় মানবদেহের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য ঝুঁকির নাম হিট স্ট্রোক। এই সমস্যার মূল কারণ হলো পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন। বিশেষ করে বয়স্ক, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী এবং শিশুরা অনেক সময় শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ার বিষয়টি সময়মতো বুঝতে পারে না। তাই এই তীব্র গরমে তাদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তীব্র গরমে শরীরের ভেতরের প্রতিক্রিয়া
সূর্যের উত্তাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় ঠান্ডা রাখার জন্য আমাদের শরীরকে বাড়তি কাজ করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় ত্বকের কাছাকাছি থাকা রক্তবাহী ধমনিগুলো তীব্র তাপ চারপাশে ছড়িয়ে দিতে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শরীর ঘামতে শুরু করে। মূলত ঘামের মাধ্যমেই শরীর থেকে অতিরিক্ত তাপ বেরিয়ে যায়।
তাপদাহের কারণে শরীরে কিছু জটিল সমস্যা দেখা দেয়:
l ত্বকের নিচের ধমনিগুলো অতিরিক্ত প্রসারিত হওয়ার কারণে রক্তচাপ কমে যায় এবং হৃৎপিণ্ডের ওপর কাজের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। শরীরের সব অংশে রক্ত পৌঁছে দিতে হৃৎপিণ্ডকে তখন দ্রুত পাম্প করতে হয়।
l এর প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে শরীরে হালকা লালচে র্যাশ বা ছোট ছোট ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে, যাতে চুলকানি হয়। অনেক সময় গরমে হাত-পা ফুলে যাওয়ার সমস্যাও তৈরি হয়।
l রক্তচাপ যদি অতিরিক্ত মাত্রায় কমে যায়, তবে হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে।
l অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে শুধু পানিই নয়, প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট বা লবণও বের হয়ে যায়। এর ফলে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে পড়া, বমি বমি ভাব, মাংসপেশিতে তীব্র খিঁচুনি, মাথাব্যথা, প্রচণ্ড ক্লান্তি এবং শরীরে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়।
হিট স্ট্রোকের উচ্চ ঝুঁকিতে যারা রয়েছেন
সাধারণত তীব্র গরমে সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষের হিট স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা কিছুটা কম থাকলেও নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির মানুষ গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। যেমন:
l বয়স্ক এবং আগে থেকেই নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন।
l টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের শরীর খুব দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং তাদের ক্ষেত্রে রোগের জটিলতা তীব্র আকার ধারণ করে।
l শিশুরা গরমে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাদের পানিশূন্যতা থেকে তাৎক্ষণিক কিডনির রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় শিশুরা নিজেদের শারীরিক অস্বস্তির কথা গুছিয়ে বলতে পারে না, ফলে সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
l যারা মৃগীরোগ, থাইরয়েডের সমস্যা, পারকিনসন্স রোগ কিংবা লিথিয়ামসমৃদ্ধ বিষণ্নতারোধী ওষুধ সেবন করেন, তাদের শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হতে পারে।
হিট স্ট্রোক বা তাপদাহে জরুরি করণীয়
অতিরিক্ত গরমে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে কোনো কালক্ষেপণ না করে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে:
আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব একটি ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত জায়গায় নিয়ে শুইয়ে দিতে হবে এবং তার পা দুটি শরীরের তুলনায় কিছুটা ওপরে তুলে রাখতে হবে। তাকে প্রচুর পরিমাণে পানি, খাবার স্যালাইন কিংবা ডাবের পানি খাওয়াতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর ঠান্ডা করার জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে ঘন ঘন পুরো শরীর মুছে দিতে হবে (স্পঞ্জিং)। বিশেষ করে বগলের নিচে, ঘাড়ে ও গলায় ঠান্ডা পানি বা বরফ দেওয়া যেতে পারে।
যদি আক্রান্ত ব্যক্তি ৩০ মিনিটের মধ্যেও স্বাভাবিক বা সুস্থ হয়ে না ওঠেন, তবে বুঝতে হবে তিনি হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। হিট স্ট্রোক হলে মানুষের স্বাভাবিক ঘাম হওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং ব্যক্তি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে শিরাপথে (আইভি) স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। রোগীর হার্ট ফেইলুর, হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা কিংবা কিডনি বিকলের লক্ষণ দেখা দিলে তাকে দ্রুত সিসিইউ (CCU) বা আইসিইউতে (ICU) স্থানান্তর করা প্রয়োজন।
হিট স্ট্রোক এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা
সচেতনতা ও কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব:
lতীব্র গরমে সরাসরি রোদের মধ্যে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমের কাজ এড়িয়ে চলুন।
l ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিনের বেলা জানালা ও বারান্দায় ভারী পর্দা টেনে দিন।
l শরীর হাইড্রেটেড রাখতে সারাদিনে প্রচুর পরিমাণে পানি, লেবুর শরবত ও তরল খাবার গ্রহণ করুন।
l চা, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় এড়িয়ে চলাই শ্রেয়, কারণ এগুলো মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে শরীরকে আরও দ্রুত পানিশূন্য করে ফেলে।
l শুধু দিনেই নয়, রাতের অতিরিক্ত গরমও শরীরের ক্ষতি করতে পারে, তাই ঘরের তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতার দিকে খেয়াল রাখুন। ঘরে এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকলে তা বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করুন।
l ঘর ঠান্ডা রাখতে মেঝেতে বা পর্দায় হালকা পানি ছিটানো যেতে পারে। বাড়িটি টিনের তৈরি হলে টিনের নিচে কাঠের সিলিং বা তাপ নিরোধক তক্তার ব্যবস্থা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
- বিষয় :
- গরম
