ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

স্তন ক্যান্সার: ঝুঁকি ও উপসর্গ

স্তন ক্যান্সার: ঝুঁকি ও উপসর্গ
×
×

ডা. মুনতাসির ফয়সাল 

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি। সামাজিক সংকোচ ও সচেতনতার অভাবে অনেক নারী স্তনে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলেও তা গোপন রাখেন বা চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে তুলনামূলক দেরিতে। অথচ স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা গেলে চিকিৎসার ফলাফল অনেক ভালো হয়।
স্তন ক্যান্সার শুধু নারীর রোগ নয়, পুরুষরাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে পুরুষের তুলনায় নারীর ঝুঁকি অনেক বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্তন ক্যান্সারের প্রায় ৯৯ শতাংশ রোগী নারী এবং প্রায় ০.৫ থেকে ১ শতাংশ রোগী পুরুষ। বয়স বাড়ার সঙ্গে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে।
স্তনের কিছু কোষ অস্বাভাবিকভাবে ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়ে টিউমার তৈরি করতে পারে। চিকিৎসা না হলে কিছু ক্ষেত্রে এই ক্যান্সার লসিকাতন্ত্র বা রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, স্তনে কোনো পিণ্ড বা পরিবর্তন দেখা দিলে সেটি ক্যান্সার–এমন নয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে হয়।

যাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া পরিবারের নিকটাত্মীয়ের স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ইতিহাস, বিশেষ করে কিছু বংশগত জিনগত পরিবর্তন যেমন BRCA1 ও BRCA2, ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে পারিবারিক ইতিহাস না থাকলেও স্তন ক্যান্সার হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীর কোনো পরিচিত পারিবারিক ইতিহাস থাকে না।
প্রজনন-সংক্রান্ত কিছু বিষয়ও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন প্রথম গর্ভধারণের বয়স বেশি হওয়া, সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানো এবং দীর্ঘদিনের কিছু হরমোন-সম্পর্কিত পরিবর্তন ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মেনোপজের পর অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, শারীরিকভাবে কম সক্রিয় থাকা এবং অ্যালকোহল সেবনও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া অল্প বয়সে বুকের এলাকায় রেডিয়েশন থেরাপির ইতিহাস এবং কিছু জিনগত পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি-কারণ। তাই পরিবারের ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।

কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করবেন না
স্তন ক্যান্সারের সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে–
চাকা বা পিণ্ড: স্তন বা বগলের নিচে নতুন কোনো শক্ত পিণ্ড বা অস্বাভাবিক ফোলা অনুভূত হওয়া।
ত্বকের পরিবর্তন: স্তনের ত্বক কুঁচকে যাওয়া, গর্তের মতো হয়ে যাওয়া, লালচে বা অস্বাভাবিক মোটা হয়ে যাওয়া।
স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন: দুই স্তনের আকৃতিতে নতুন কোনো পার্থক্য দেখা দেওয়া।
বোঁটার পরিবর্তন: বোঁটা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া বা বোঁটা থেকে অস্বাভাবিক তরল (বিশেষ করে রক্তযুক্ত কষ বা নিঃসরণ) বের হওয়া।
ব্যথা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন: স্তনে নতুন ও স্থায়ী কোনো পরিবর্তন দেখা দেওয়া।
এগুলোর কোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে পরিবর্তনটি নতুন হলে বা থেকে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ অনেক ধরনের নিরীহ সমস্যাতেও একই রকম লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

নিজে পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে কী করবেন
নারীরা নিজের স্তনের স্বাভাবিক চেহারা ও অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুই স্তনের আকার, ত্বক ও বোঁটার কোনো নতুন পরিবর্তন আছে কিনা খেয়াল করা যায়। গোসলের সময়ও হাত দিয়ে অস্বাভাবিক পিণ্ড বা পরিবর্তন অনুভব করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
তবে শুধু নিজে পরীক্ষা করলে স্তন ক্যান্সারের স্ক্রিনিং সম্পূর্ণ হয় না। বর্তমান নির্দেশনায় গড় ঝুঁকির নারীদের ক্ষেত্রে বয়স ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী ম্যামোগ্রাম করার বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে বয়স কম হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কীভাবে স্তন ক্যান্সার শনাক্ত করা হয়
ম্যামোগ্রাম স্তনের বিশেষ ধরনের এক্স-রে, যা কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগে অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে। তবে কখন থেকে এবং কত ঘন ঘন ম্যামোগ্রাম করা হবে, তা ব্যক্তির বয়স ও ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে।
আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির বর্তমান নির্দেশনায় গড় ঝুঁকির নারীদের ৪০ থেকে ৪৪ বছর বয়সে চাইলে বার্ষিক ম্যামোগ্রাম শুরু করার সুযোগ রয়েছে; ৪৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সে প্রতি বছর ম্যামোগ্রাম করার সুপারিশ করা হয়। ৫৫ বছর বা তার বেশি বয়সে প্রতি দুই বছর পরপর অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিবছর করা যেতে পারে।
অন্যদিকে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে আরও আগে এবং অতিরিক্ত পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। যেমন নির্দিষ্ট বংশগত জিনগত পরিবর্তন, শক্তিশালী পারিবারিক ইতিহাস বা অল্প বয়সে বুকের এলাকায় রেডিয়েশন থেরাপির ইতিহাস থাকলে চিকিৎসক ম্যামোগ্রামের পাশাপাশি এমআরআই স্ক্রিনিংয়ের পরামর্শ দিতে পারেন।
স্তনে কোনো সন্দেহজনক পরিবর্তন পাওয়া গেলে চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা, প্রয়োজন অনুযায়ী আলট্রাসাউন্ড বা ম্যামোগ্রাম এবং নিশ্চিত হওয়ার জন্য বায়োপসি করতে পারেন। এফএনএসি (Fine Needle Aspiration Cytology - সুঁই দিয়ে রস বা কোষ পরীক্ষা) কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও সব ধরনের স্তন ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য এটি একমাত্র বা চূড়ান্ত পরীক্ষা নয়। ক্যান্সারের ধরন ও বিস্তার অনুযায়ী চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নির্ধারণ করেন।

চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন ও পর্যায়ের ওপর
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা সবার জন্য এক রকম নয়। ক্যান্সারের ধরন, আকার, রোগের পর্যায়, লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়েছে কিনা এবং শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়েছে কিনা–এসব বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।
চিকিৎসার মধ্যে অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ইমিউনোথেরাপি থাকতে পারে। অনেক সময় একাধিক চিকিৎসা পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়।

জীবনযাত্রায় পরিবর্তনেও কমতে পারে ঝুঁকি

স্তন ক্যান্সারের সব ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা বা কমানো গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার সঙ্গে স্তনসহ বিভিন্ন ক্যান্সারের ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি বা জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ব্যবহারের প্রয়োজন হলে নিজের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য উপকার-ক্ষতি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা কিছু নারীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ঝুঁকি কমানোর ওষুধও বিবেচনা করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্তনে কোনো নতুন পরিবর্তনকে লজ্জা বা ভয় থেকে লুকিয়ে না রাখা। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া, নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানা এবং বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী উপযুক্ত স্ক্রিনিং করানো–স্তন ক্যান্সার মোকাবিলায় এগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। 

[লেখক: বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক]

আরও পড়ুন

×