ওষুধের উপাদান এক, কার্যকারিতা কি সমান?
আমির আবদুল্লাহ
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাড়ার যেকোনো ফার্মেসিতে ঢুকলেই চোখে পড়বে একই উপাদান, একই মাত্রা, এমনকি দেখতেও প্রায় একরকম–এমন কয়েকটি ওষুধ পাশাপাশি সাজানো। কিন্তু আসল প্রশ্নটা থেকেই যায়: শরীরের ভেতরে গিয়ে এরা কি সত্যিই একইভাবে কাজ করে?
দেশে তৈরি ওষুধ নিয়ে আমাদের গর্বের যথেষ্ট কারণ আছে। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমাদের কোম্পানিগুলো এখন বিদেশেও ওষুধ রপ্তানি করছে। তবে ওষুধে সঠিক উপাদান আছে, শুধু এটুকু প্রমাণ এখন আর যথেষ্ট নয়। একটি স্বীকৃত রেফারেন্স ওষুধের তুলনায় আমাদের ওষুধ শরীরে কতটা একইভাবে শোষিত হয়, তার প্রমাণও এখন সমান জরুরি।
সহজ কথায় বায়োইকুইভ্যালেন্স
বায়োইকুইভ্যালেন্স বা জৈব সমতুল্যতার মানে হলো, একই ওষুধের দুটি পণ্য সেবনের পর রক্তে সক্রিয় উপাদান প্রায় একই পরিমাণে এবং একই গতিতে পৌঁছায়। গবেষকেরা দেখেন, শরীর মোট কতটা ওষুধ শোষণ করল এবং রক্তে ওষুধের সর্বোচ্চ মাত্রা কত হলো। এরপর পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করা হয়, দুটি ওষুধের শোষণ যথেষ্ট কাছাকাছি কি না।
কেন বাংলাদেশের জন্য জরুরি
একই সক্রিয় উপাদান থাকলেও দুটি ট্যাবলেটের আচরণ ভিন্ন হতে পারে। এর পেছনে থাকতে পারে উপাদানের মিশ্রণ, ফর্মুলেশন, উৎপাদনপ্রক্রিয়া, দ্রবণের হার বা স্থিতিশীলতার পার্থক্য। ল্যাবরেটরির নিয়মিত পরীক্ষায় ওষুধের পরিচয়, শক্তিমাত্রা ও বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হয়। আর বায়োইকুইভ্যালেন্স নিশ্চিত করে, সেবনের পর শরীরে ওষুধটি প্রত্যাশিতভাবে কাজ করছে।
ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩-এ ওষুধের মান ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বায়োইকুইভ্যালেন্স সমীক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের সক্ষমতা বাড়লে দেশীয় ওষুধের প্রতি আস্থা বাড়বে, চিকিৎসকেরা আরও তথ্যনির্ভরভাবে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারবেন এবং কম খরচে রোগীর চিকিৎসার সুযোগ বাড়বে।
দেশের কিছু ওষুধ কোম্পানি ইতোমধ্যে বিষয়টির গুরুত্ব বুঝেছে। যেমন রেনাটা পিএলসি জানিয়েছে, দেশে ও বিদেশে তাদের ১০০টি বায়োইকুইভ্যালেন্ট ওষুধ বাজারে আছে। এতে বোঝা যায়, দেশেই এই সক্ষমতা গড়ে উঠছে।
তবে সব জেনেরিক ওষুধ আপনা-আপনি বায়োইকুইভ্যালেন্ট নয়। মানুষের ওপর যথাযথভাবে পরিচালিত সমীক্ষার মাধ্যমে, অথবা বৈজ্ঞানিকভাবে যৌক্তিক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত ল্যাবরেটরি ফলাফলের মাধ্যমে এটি প্রমাণ করতে হয়। কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা লাগে; যেমন বায়োলজিক্যাল ওষুধের তুলনার পদ্ধতি আলাদা।
দাবি নয়, প্রমাণ চাই।
ওষুধ কোম্পানিগুলোর উচিত য়োইকুইভ্যালেন্সের তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা। মোড়কে বা প্রচারে শুধু ‘বায়োইকুইভ্যালেন্ট’ লিখে দিলেই হবে না; কোন ওষুধকে রেফারেন্স ধরা হয়েছে, সমীক্ষা কোথায় হয়েছে এবং ফলাফল কী, সেসব তথ্যও জানাতে হবে।
মানদণ্ড হালনাগাদ করে এবং বায়োইকুইভ্যালেন্স প্রমাণিত ওষুধের একটি জাতীয় তথ্যভান্ডার গড়ে তুলে আমরা এই আস্থা আরও মজবুত করতে পারি। চিকিৎসকদের ধারাবাহিক চিকিৎসা শিক্ষা (সিএমই) কর্মসূচিতেও বিষয়টি যুক্ত করা যেতে পারে।
বায়োইকুইভ্যালেন্স কেবল একটি কারিগরি শর্ত বা বিপণনের শব্দ নয়। কারখানায় তৈরি ওষুধ আর রোগীর শরীরে তার প্রভাব, এই দুইয়ের মধ্যে সেতুবন্ধ এটি। উন্নত মানদণ্ড ও প্রমাণ চিকিৎসকের আস্থা বাড়াবে, রোগীর চিকিৎসাপ্রাপ্তি সহজ করবে এবং বিশ্বে বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের মর্যাদা আরও উঁচু করবে।
[লেখক: হেড অব মার্কেটিং, অনকোলজি অ্যান্ড হেমাটোলজি পোর্টফোলিও, রেনাটা পিএলসি]
- বিষয় :
- ওষুধ