ঢাকা রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

লিভারের রোগ মেটাবলিক ডিসফাংশন

লিভারের রোগ মেটাবলিক ডিসফাংশন
×
×

ডা. শাহজাদা সেলিম

প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

কায়িক পরিশ্রম একেবারেই না করা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ফলে দেহের অতিরিক্ত চর্বি লিভারে জমতে শুরু করে। অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ, বিশেষ করে পেটে বা কোমরের চারপাশে চর্বি জমা (উদরীয় স্থূলতা) এই রোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ কারণ

বর্তমান বিশ্বে নীরব অথচ অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া একটি লিভারের গুরুতর রোগ হলো বিপাকীয় ত্রুটিজনিত চর্বিযুক্ত লিভার ব্যাধি (সংক্ষেপে ‘এমএএসএলডি’)। আগে এই রোগটি চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ নামে বহুল পরিচিত ছিল। তবে বিশ্বজুড়ে লিভার বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে বর্তমানে এই নতুন নামটি সর্বসম্মতিক্রমে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা রোগটির মূল কারণ ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

বিপাকীয় ত্রুটিজনিত চর্বিযুক্ত লিভার ব্যাধি কী?
এটি মূলত এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে অতিরিক্ত মদ্যপান বা অ্যালকোহল গ্রহণ না করা সত্ত্বেও ধীরে ধীরে লিভারের কোষে অতিরিক্ত ফ্যাট বা চর্বি জমা হতে থাকে। এর সঙ্গে শরীরের কিছু জটিল বিপাকীয় সমস্যা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকে। যেমন—
l শরীরের মাত্রাতিরিক্ত স্থূলতা বা মেদবৃদ্ধি
l টাইপ-২ ডায়াবেটিস বা রক্তে অনিয়ন্ত্রিত শর্করা
l অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ
l রক্তে ক্ষতিকর চর্বি বা ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বৃদ্ধি
l ইনসুলিনের সঠিক কার্যকারিতা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমে যাওয়া।
শরীরে যখন ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, তখন রক্তে থাকা অতিরিক্ত শর্করা ও চর্বি জমা করার প্রধান স্থান হয়ে ওঠে লিভার, যা পরবর্তী সময়ে জটিল প্রদাহের সৃষ্টি করে।
রোগটি কেন আশঙ্কাজনক?
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে অন্তত একজন এই রোগে আক্রান্ত বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং স্থূলতার হারের কারণে রোগটির প্রকোপ জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো–এই রোগের প্রাথমিক বা মাঝারি পর্যায়ে সাধারণত কোনো প্রকার বাহ্যিক লক্ষণ, যন্ত্রণা বা অস্বস্তি প্রকাশ পায় না। বহু মানুষের ক্ষেত্রে অন্য কোনো সাধারণ শারীরিক সমস্যার কারণে আলট্রাসোনোগ্রাফি বা রক্ত পরীক্ষা করতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত ফ্যাটি লিভার ধরা পড়ে।
সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন না আনলে এটি ধীরে ধীরে ভয়াবহ জটিল রূপ ধারণ করতে পারে, যেমন–
l স্টিয়াটো-হেপাটাইটিস: লিভারের কোষে স্থায়ী মেদ জমার কারণে তীব্র প্রদাহ ও ক্ষত সৃষ্টি হওয়া।
l লিভার ফাইব্রোসিস: প্রদাহের ফলে লিভারের নরম টিস্যু শক্ত ও অকার্যকর হয়ে যাওয়া।
l লিভার সিরোসিস: লিভারের গঠন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং চূড়ান্ত অকার্যকারিতা।
l লিভার ক্যান্সার: দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতের ফলে লিভারে ম্যালিগন্যান্ট টিউমার বা ক্যান্সার হওয়া।
তাছাড়া, চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শুধু লিভার নয়, বরং প্রাণঘাতী হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকিও সাধারণ মানুষের তুলনায় বহুলাংশে বেড়ে যায়।
এই রোগ কেন হয়?
রোগটির মূল ভিত্তি হলো দেহে গৃহীত শক্তি এবং ব্যয়িত শক্তির মধ্যকার ব্যাপক ভারসাম্যহীনতা। অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার গ্রহণ, কায়িক পরিশ্রম একেবারেই না করা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ফলে দেহের অতিরিক্ত চর্বি লিভারে জমতে শুরু করে। বিশেষ করে পেটে বা কোমরের চারপাশে চর্বি জমা (উদরীয় স্থূলতা) এই রোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ কারণ।
এছাড়া পারিবারিক বংশগত বা জিনগত প্রবণতা, প্রক্রিয়াজাত অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অপর্যাপ্ত বা অনিয়মিত ঘুম এবং মানসিক চাপও এই ব্যাধি ত্বরান্বিত করতে বড় ভূমিকা রাখে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
যেহেতু প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উপসর্গ থাকে না, তাই অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা সাধারণত বেশ কিছু আধুনিক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটির উপস্থিতি ও তীব্রতা নিশ্চিত করেন—
l লিভার এনজাইম পরীক্ষা: রক্তে এএলটি (ALT) এবং এএসটি (AST)-এর মাত্রা যাচাই করা।
l আলট্রাসোনোগ্রাফি: লিভারে চর্বির প্রাথমিক উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ।
l ফাইব্রোস্ক্যান বা ইলাস্টোগ্রাফি: লিভার কতটুকু শক্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা মেপে দেখা।
l লিভার বায়োপসি: অত্যন্ত জটিল ক্ষেত্রে নিশ্চিত হওয়ার জন্য লিভারের অতি ক্ষুদ্র টিস্যু পরীক্ষা।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা অতিরিক্ত মেদে ভুগতে থাকা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত বিরতিতে স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি।

চিকিৎসা ও করণীয়
এই ব্যাধি নিরসনে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো জীবনযাত্রায় বাস্তবসম্মত ও স্থায়ী পরিবর্তন আনা। কোনো নির্দিষ্ট একক ওষুধ বা অলৌকিক পথ্য এই রোগকে পুরোপুরি নিরাময় করতে পারে না।

প্রধান করণীয় বিষয়গুলো হলো—
l ওজন নিয়ন্ত্রণ: শরীরের বর্তমান ওজনের অন্তত শতকরা ৭ থেকে ১০ ভাগ কমানো।
l নিয়মিত শরীরচর্চা: প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা বা অ্যারোবিক ব্যায়াম করা।
l খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন: অতিরিক্ত মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত ফাস্টফুড পুরোপুরি বর্জন করা।
l শর্করা ও চর্বি নিয়ন্ত্রণ: রান্নায় পরিমার্জিত তেল, ট্রান্সফ্যাট এবং অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে শাকসবজি ও ফলমূল বেশি খাওয়া।
l সহযোগী রোগ নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও রক্তের চর্বি কঠোর নিয়মে নিয়ন্ত্রণে রাখা।
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে টাটকা সবজি, ফলমূল, দেশি মাছ, বাদাম ও অলিভ অয়েলসমৃদ্ধ খাবার লিভারের জমে থাকা ফ্যাট দ্রুত দূর করতে অসামান্য ভূমিকা রাখে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও সচেতনতা
এই রোগটি এখন আর কেবল লিভারের একক কোনো সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি পুরো দেহের বিপাক প্রক্রিয়ার একটি বৈশ্বিক ব্যাধি। তাই এই রোগ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্য পর্যায়ে ব্যাপক সচেতনতা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিমিত আহার এবং সক্রিয় জীবনযাপন গ্রহণের মাধ্যমে এই নীরব ব্যাধি সহজে প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে–লিভারের স্থায়ী ক্ষতি বা সিরোসিস শুরু হওয়ার আগেই সচেতন হওয়া হলো সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা মূলত এই রোগ মোকাবিলার মূল অস্ত্র।
[সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

আরও পড়ুন

×