যুদ্ধ ও খরার চাপে বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম, সংকট চলতে পারে ২০২৭ সালেও
ছবি: রয়টার্স
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬ | ১৯:৫৪
বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি আগামী কয়েক মাসে আরও বাড়তে পারে। যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য এবং এল নিনোর প্রভাবে খরার কারণে শস্য উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব কারণে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার চাপ ২০২৭ সালজুড়েও অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
খাদ্যের দাম বাড়ায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর দরিদ্র জনগোষ্ঠী। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব অঞ্চলের পরিবারগুলো আয়ের বড় অংশ খাবার কেনার পেছনে ব্যয় করে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে এবং সম্ভবত পুরো ২০২৭ সালজুড়েই এর বড় প্রভাব দেখা যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৫০টি দেশের মধ্যে ২২ শতাংশ দেশে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি ছিল। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দামের পরিবর্তন পরিমাপকারী এফএওর খাদ্যমূল্য সূচক গত সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। ২০২২ সালের নভেম্বরের পর এটি ছিল সর্বোচ্চ।
যুদ্ধ ও পরিবহন ব্যয়ে বাড়ছে চাপ
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য পরিবহন অবকাঠামোয় হামলার কারণে গমের চালান ব্যাহত হচ্ছে। এতে মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে গম সংগ্রহের চেষ্টা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, লোহিত সাগরের নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়ানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানিতেও বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। এতে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি উৎপাদনকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বড় মজুত থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল, সেখান থেকে কিছুটা কমলেও এখনো তা বেশি।
মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় এক পাউরুটির দাম জুলাই মাসের চার পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় পাঁচ মিসরীয় পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বিশ্বের বৃহত্তম পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও চলতি বছরে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।
ভারতে উৎপাদন ঘাটতির কারণে সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু আন্তর্জাতিক নৌপথে, বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পরিবহনের ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত ব্যয় এর অন্যতম কারণ।
নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেন, পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়িক পরিবেশ কঠিন হয়ে উঠেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন বাস্তব সমস্যা।
মজুত কমলে বাড়তে পারে দাম
বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার পেছনে সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভালো ফলনের কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি বড় আমদানিকারক দেশ সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছিল। স্থানীয় মজুত কমে আসায় এখন তাদের আবার আমদানিতে ফিরতে হতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার কারাভাইতসেভ বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারক দেশগুলো বাজারে ফিরলে চাহিদার বড় একটি নতুন ঢেউ তৈরি হতে পারে।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ তোরেরো বলেন, আগের মৌসুমগুলোতে ভালো ফলন ও বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুত বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছিল। তবে সেই সুরক্ষা এখন চাপের মুখে। ফলে পণ্যের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠান সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। নতুন চুক্তি করার সময় তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ব্যয় আরও বাড়ছে।
ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাং বলেন, জাহাজভাড়া বেড়েছে। একই সঙ্গে ইন্দোনেশীয় মুদ্রা রুপিয়াহর দর কমে যাওয়ায় ডলারে পরিশোধ করা আমদানি ব্যয়ের প্রভাব স্থানীয় মুদ্রায় আরও বেশি হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
- বিষয় :
- যুদ্ধ
- খরা
- খাদ্যপণ্য
- দাম বৃদ্ধি