ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা ব্যয় অর্ধেকে নেমেছে
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৫৪
করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোর ব্যয় কমে প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। গত বছর ব্যাংকগুলো এ খাতে মাত্র ৩৪৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। ২০২৪ সালে যা ছিল ৬১৭ কোটি টাকা। ২০২২ সালে ব্যয় হয় ১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। চার বছরের ব্যবধানে সিএসআর ব্যয় কমে এক-তৃতীয়াংশে নেমেছে। মূলত ব্যাংকগুলোর কাগুজে প্রতিবেদন দেখানোর সুযোগ বন্ধ হওয়ায় নিট মুনাফা কমেছে। ফলে সিএসআর ব্যয়ে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিদ্যমান নিয়মে কোনো ব্যাংক নিট লোকসানে থাকলে সিএসআর খাতে ব্যয় করতে পারে না। আগে নানা উপায়ে খেলাপি ঋণ কম দেখিয়ে মুনাফা দেখানোর সুযোগ পেত ব্যাংকগুলো। নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতি থাকার পরও ডেফারেল তথা প্রভিশন সংরক্ষণে বাড়তি সময় নিয়ে নিট মুনাফা দেখাত। তবে দুই বছর ধরে ডেফারেল সুবিধা নেওয়া কোনো ব্যাংক নিট মুনাফা দেখাতে পারছে না। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ব্যাপক বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক এখন লোকসানে চলছে। ব্যাংকগুলো ২০২৪ সালের নিট মুনাফার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের এই সিএসআর ব্যয় করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নিট মুনাফা করতে পারেনি ১৫টি ব্যাংক। এ তালিকায় রয়েছে সরকারি মালিকানার জনতা, অগ্রণী, বেসিক, বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। আর বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে এবি, বাংলাদেশ কমার্স, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী, আইসিবি ইসলামী, আইএফআইসি, ন্যাশনাল, এনআরবি কমার্শিয়াল ও পদ্মা ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ ও কর-পরবর্তী নিট মুনাফার একটি অংশ সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতে ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। অবশ্য একটি ব্যাংক মুনাফার কত অংশ সিএসআর করবে বা আদৌ করবে কিনা, সেটি ওই ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। তবে কোনো ব্যাংক ব্যয় করলে অনুপাত কী হবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। যদিও অধিকাংশ ব্যাংক এই নিয়ম না মেনে নিজেদের মতো করে সিএসআর করে থাকে। বর্তমানে একশ টাকা সিএসআর করলে তার মধ্যে শিক্ষায় ৩০ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ৩০ শতাংশ খরচ করার নির্দেশনা রয়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা প্রশমন খাতে ২০ শতাংশ ব্যয় করতে হবে। বাকি ২০ শতাংশ আয়-উৎসারী বিভিন্ন কাজ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি এবং অন্যান্য খাতে খরচ করার নিয়ম করে দেওয়া হয়েছে।
গত বছর মোট ৩৪৫ কোটি টাকা সিএসআর ব্যয়ের মধ্যে শিক্ষা খাতে হয়েছে ২৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগের বছর যা মাত্র ১৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ ছিল। স্বাস্থ্য খাতে আগের বছরের ২৫ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ২৪ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমেছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে আগের বছরের ২২ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ১০ শতাংশে নেমেছে। অন্যান্য খাতে এবার ব্যয় হয়েছে ৩৬ দশমিক ৬৫ শতাংশ। আগের বছর যা ৫৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিএসআর ব্যয়ের প্রতিবেদনে প্রতিটি ব্যাংকের নিট মুনাফা বা লোকসানের তথ্য প্রকাশ করে আসছিল। তবে এবার আর এ তথ্য দেওয়া হয়নি। বেশির ভাগ ব্যাংকের মুনাফা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় তথ্য দেওয়া হয়নি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তবে কোন ব্যাংক কত টাকার সিএসআর ব্যয় করেছে, সে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
এবার সিএসআর ব্যয়ে শীর্ষে রয়েছে বিদেশি মালিকানার স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক। ব্যাংকটি গত বছর মোট ৩৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সিএসআর করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে একীভূত হওয়া এক্সিম ব্যাংক। গত বছর এক্সিম ব্যাংক ২৬ কোটি ৮২ লাখ টাকার সিএসআর ব্যয় করেছে। শীর্ষ ১০ ব্যাংকের তালিকায় থাকা অন্য ব্যাংকগুলো মধ্যে যমুনা ব্যাংক ২৫ কোটি ২৮ লাখ, ব্র্যাক ব্যাংক ২৪ কোটি ৭১ লাখ, মার্কেন্টাইল ২৪ কোটি ২৪ লাখ, পূবালী ব্যাংক ২২ কোটি ৯৪ লাখ, ডাচ্-বাংলা ২০ কোটি ৬৯ লাখ, শাহজালাল ইসলামী ২০ কোটি ৫৭ লাখ, প্রাইম ব্যাংক ১৩ কোটি এবং সিটি ব্যাংক ১১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, একটি সময় সিএসআর ব্যয়ে শীর্ষে ছিল ইসলামী ব্যাংক। ২০২২ সালে শুধু ইসলামী ব্যাংক সিএসআর খাতে ৩২৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছিল। গত বছর সেই ব্যয় মাত্র ৮ কোটি ১৫ লাখ টাকায় নেমেছে। ব্যাংকটি ২০২৫ সালে বড় ধরনের লোকসানে পড়েছে। ফলে আগামী বছর এই ব্যাংক এক টাকাও আর সিএসআর করতে পারবে না। মূলত নানা অনিয়ম-জালিয়াতির মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের প্রকৃত চিত্র সামনে আসায় শীর্ষ ব্যয়ের ব্যাংক এখন সবচেয়ে লোকসানে। অন্য অনেক ব্যাংকের একই রকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
- বিষয় :
- সামাজিক নিরাপত্তা
- ব্যাংক
