মূল্যস্ফীতি ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:৫৩ | আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬ | ১১:৫৪
মাঝে এক মাস কমার পর আবার টানা দুই মাস বাড়ল মূল্যস্ফীতি। এপ্রিলের পর মে মাসেও বেড়েছে মূল্যস্ফীতির হার। গত মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এটি গত বছরের জানুয়ারি মাসের পর সর্বোচ্চ। ওই মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি হয় ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল রোববার এ সম্পর্কিত সর্বশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে বিবিএস। প্রতিবেদনে দেখা যায়, মে মাসে খাদ্যপণ্যের চেয়ে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বেশি ছিল। মাসটিতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে এটি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ।
প্রতি মাসে মাঠপর্যায় থেকে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামের তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে বিবিএস। প্রাপ্ত তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করে ভোক্তা মূল্য সূচক (সিপিআই) প্রণয়ন করা হয়। এ সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কতটা বাড়ল তার শতকরা হারই পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি। এটির ১২ মাসের হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি হয় বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির তথ্যউপাত্ত।
টানা চার মাস বাড়ার পর পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি খানিকটা কমেছে। মূল্যস্ফীতি বাড়তির প্রবণতার মধ্যে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়। ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ, যা ছিল ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম পূর্ণ মাস মার্চে মূল্যস্ফীতি কমে আসে। ওই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয় ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। কিন্তু এই শুভ সূচনা ধরে রাখা যায়নি। পরের মাস এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ফের বেড়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে। সে ধারাবাহিকতায় মে মাসেও মূল্যস্ফীতি বাড়ল।
মে মাসে শহরের তুলনায় গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি হয়েছে। বিবিএসের হিসাব বলছে, মাসটিতে গ্রামে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলে ছিল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। অবশ্য খাদ্যপণ্যে গ্রামের চেয়ে শহরে মূল্যস্ফীতি বেশি ছিল মে মাসে। এ সময় গ্রামে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৯৫ শতাংশ, যা শহরাঞ্চলে ছিল ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে মূল্যস্ফীতি ব্যাপকহারে বেড়ে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ হার শহরাঞ্চলে ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ।
কনুজমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি সাবেক সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, মে মাসে মূল্যস্ফীতি এতটা বেড়ে যাওয়ার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের প্রভাব। দ্বিতীয়ত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকা।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দর দুই দফায় বাড়ানো হয়েছে। এর একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব তো আছেই। জ্বালানি তেলের সংকটে যানবাহন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ধরে লাইনে অপেক্ষা করে তেল নিয়েছে। তারও একটা প্রভাব পড়েছে বাজারে। অন্যদিকে পরিবহনে চাঁদাবাজি, হাটে-ঘাটে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেড়েছে। সরবরাহ চেইনেও আছে দুর্বলতা। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নজরে আসেনি।
এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এক দিকে সামাজিক সুরক্ষায় অনেক কার্ড দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে কার্ডধারী ১ শতাংশ মানুষের তেমন কোনো উপকার হচ্ছে না। তাদের কথা যদি বাদ দিই, তাহলেও বাকি ৯৯ শতাংশ মানুষ তো মূল্যস্ফীতির চাপে বড় কষ্টে আছে।’
ক্যাব সভাপতির মতে, নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী সরকারের অগ্রাধিকার বিন্যাসে কিছুটা সমস্যা আছে। খাল কাটার মতো জনপ্রিয় কর্মসূচি নেওয়ার আগে জনগণকে মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া বেশি জরুরি ছিল।
এদিকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বাড়ার হার অনেক কম। কৃষির মতো প্রধান পেশায় মজুরি বাড়ার হার বরং কমেছে। বিবিএসের মজুরি হার সূচক (ডব্লিউআরআই) অনুযায়ী, মে মাসে গড় মজুরি হার বেড়েছে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। গত বছরের মে মাসেও এ হার ছিল। তবে গত এপ্রিল মাসের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। এপ্রিল মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
বিবিএসের প্রতিবেদন বলছে, মে মাসে কৃষিতে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সেবা খাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। মে মাসে সেবায় মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৬, যা গত বছরের এই মাসে ছিল ৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অবশ্য শিল্প খাতে পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। এই খাতে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১৫, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ।
- বিষয় :
- মূল্যস্ফীতি
