সিএফএ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
ঋণ ঝুঁকি ইস্যুতে বড় সংকটে পড়ার শঙ্কায় দেশ: মাসরুর রিয়াজ
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ২৩:৪৮
দেশের ঋণের স্থায়িত্বের ঝুঁকি বর্তমানে ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম-নিম্ন’ পর্যায়ে চলে এসেছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে দেশ মাঝারি ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
পেশাদার চার্টার্ট অ্যাকাউন্টেসদের সংগঠণ সিএফএ সোসাইটির দশম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠানে আয়োজিত ‘আর্থিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে এগিয়ে চলা, আস্থার এক দশকের উদ্যাপন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।
মাসরুর রিয়াজ বলেন- আমরা ইতিমধ্যে ঋণের স্থায়িত্বের ঝুঁকির ক্ষেত্রে 'নিম্ন' থেকে 'মধ্যম-নিম্ন' পর্যায়ে চলে এসেছি। যদি বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে সর্বোচ্চ তিন বছরের মধ্যে আমরা মাঝারি ঝুঁকির ক্যাটাগরিতে পড়ে যাব। চিন্তা করে দেখুন, যখন একটি দেশ ৫-৬ বছরের মধ্যে নিম্ন ঝুঁকি থেকে মাঝারি ঝুঁকিতে চলে যায়, তখন আমাদের বৈশ্বিক অর্থায়ন সহযোগী বা বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া কী হবে?
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ তার বক্তব্যে সরকারের ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি এবং এর ফলে বেসরকারি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন যে, বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি সাধারণত ৫ শতাংশের আশেপাশে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও বাস্তবায়ন অদক্ষতার কারণে তা ৩.৫ থেকে ৪ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। তিনি এই ঘাটতি ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার তাগিদ দিয়ে বলেন, যদি বাজেট ঘাটতি বাড়তে থাকে, তবে তা বেসরকারি খাতকে অর্থায়নের দৌড় থেকে ছিটকে দেবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার যখন তার বড় অংকের বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি মাত্রায় ঋণ নেয়, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে বেসরকারি শিল্প বা ব্যবসা খাতে ঋণ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তহবিল থাকে না। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে সরকারের অর্জিত মোট রাজস্ব মূলত পরিচালন বা সাধারণ ব্যয় মেটাতেই শেষ হয়ে যায়। ফলে দেশের যাবতীয় উন্নয়নমূলক কাজ মূলত ঋণের ওপর ভিত্তি করেই সম্পন্ন করতে হয়। এই ঋণ নির্ভরতা এবং বড় অংকের বাজেট ঘাটতি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের অন্যতম এক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এ প্রধান বলেন, চাইলে সঠিক রাজস্ব কাঠামোর মাধ্যমে এটি এখনও এড়িয়ে যেতে পারি, এটা সম্ভব। কিন্তু আমরা যদি সত্যিই মাঝারি ঝুঁকির ক্যাটাগরিতে গিয়ে পৌঁছায়, তবে স্থানীয় বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ সম্প্রদায়ের সাথে আমাদের সম্পৃক্ততা বাধাগ্রস্ত হবে।
গত শনিবার রাতে সিএফএ সোসাইটি আয়োজিত অনুষ্ঠানটি হয় রাজধানীর বনানীস্থ শেরাটন হোটেলে। অনুষ্ঠানে দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবী, নীতিনির্ধারক এবং সিএফএ চার্টারহোল্ডাররা অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তিনি পুঁজিবাজারের আধুনিকায়ন এবং সংস্কারের ওপর বিশদ বক্তব্য দেন।
বিএসইসির চেয়ারম্যান তাঁর বক্তব্যে ‘স্মার্ট রেগুলেশন’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলেন, যেখানে প্রয়োজন সেখানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পদ্ধতিগুলোকে যতটা সম্ভব সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করা জরুরি।
মাসুদ খান তার দীর্ঘ ৪৬ বছরের করপোরেট যাত্রার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, পুঁজিবাজারে সুশাসন নিশ্চিত করতে তিনি বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআরের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় ও সংলাপের পক্ষে কাজ করছেন। যেকোনো পরিবর্তন আনায় বাজার অংশীজনদের সঙ্গে কার্যকর সংলাপ করে তাদের মতামত নেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দেন।
দেশের শেয়ারবাজারের বর্তমান ডিজিটালাইজেশনের অভাবকে একটি ‘ভয়াবহ গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেন। মাসুদ খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানের আধুনিক যুগেও আইপিও বা রাইট ইস্যুর আবেদনগুলো কাগজে করতে হয়, যা অত্যন্ত সেকেলে এবং স্বচ্ছতার অন্তরায়। তিনি এ পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত স্বয়ংক্রিয় বা ডিজিটাল করার প্রতিশ্রুতি দেন যাতে ফাইলের অবস্থান ও কাজের গতি দৃশ্যমান হয়।
এছাড়া মিউচুয়াল ফান্ডের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে প্রতিটি ফান্ডের কার্যকারিতা বা কেপিআই একটি নির্দিষ্ট পোর্টালে প্রকাশের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে- এভাবে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগ করতে পারবেন।
পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে মাসুদ খান বলেন, বাংলাদেশের বাজার বর্তমানে মূলত সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নির্ভর, যা বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।
তিনি পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন জানিয়ে বলেন, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর প্রভিডেন্ড ফান্ড এবং গ্র্যাচুইটি ফান্ড পুঁজিবাজারে আনার জন্য আইনি সংস্কার প্রয়োজন। সিএফএ চার্টারহোল্ডারদের 'ফাইন্যান্স স্পেশালিস্ট' হিসেবে অভিহিত করে তিনি বাজারের কারিগরি ও গুণগত উন্নয়নে তাদের আরও জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা করেন।
অন্যদিকে, ড. মাসরুর রিয়াজ তার মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।
তিনি দেখান, ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো যেখানে বাজেট স্বচ্ছতা এবং সরকারি কার্যকারিতার বৈশ্বিক সূচকে অনেক এগিয়ে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত ৩০-৪০ বছর ধরে বাংলাদেশের বাজেট ও কর নীতি মূলত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়, প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করার জন্য নয়। দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কৌশল না থাকায় আর্থিক নীতিগুলো লক্ষ্যহীনভাবে কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশের অন্যতম বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এ প্রধান বলেন, বার্ষিক বাজেটগুলো প্রণয়ন করা হয়, আগের বাজেটটির নানা খাতে অল্প-বিস্তর কাঁটছাট করে। কখনও মধ্য বা দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা নিরূপন করে নয়। দেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারের কোথায় বিনিয়োগ প্রয়োজন, সে দিকও বাজেট তৈরিতে বিবেচনা করা হয় না।
লজিস্টিক খাতের অদক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতাকে রপ্তানি সক্ষমতার প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে মাসরুর রিয়াজ বলেন, ভারতের মতো দেশগুলো যেখানে দ্রুততম সময়ে বন্দর বা টার্মিনাল নির্মাণ শেষ করে কার্যক্রম শুরু করছে, সেখানে বাংলাদেশে ‘বে টার্মিনাল’ এর মতো বড় প্রকল্পগুলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ঝুলে আছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে তিনি বাজেট ঘাটতি ৩ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা, মধ্যমেয়াদী আর্থিক কাঠামো পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং একটি কেন্দ্রীয় ঋণ ব্যবস্থাপনা অফিস প্রতিষ্ঠার জোর সুপারিশ করেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে দেশের আর্থিক খাতের উন্নয়নে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
- বিষয় :
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
