সিপিডির বাজেট সংলাপ
ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় সরকার
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ১২:০৯ | আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ | ১২:১৭
বিশাল বাজেট এবং তা বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রাকে ‘বাস্তবতা বর্জিত’ বলে সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। বাজেট ঘাটতি মেটাতে বড় অঙ্কের ব্যাংক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার সমালোচনা করে তারা বলেছেন, এতে করে বেসরকারি খাত পুঁজির সংকটে পড়বে। তাদের এ উদ্বেগের যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা থেকে সরকার ক্রমান্বয়ে বেরিয়ে আসবে।
গতকাল রোববার বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি আয়োজিত বাজেট সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে সরকার অনেক টাকা নিলে বেসরকারি খাত অর্থায়ন সংকটে পড়তে পারে বলে সবার উদ্বেগের সঙ্গে তিনি একমত। তিনি এ কথা গত কয়েক বছর ধরে বলে আসছেন।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সংলাপে সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। বাজেটের ওপর সিপিডির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ব্যাংক থেকে সরকার বিশাল অঙ্কের ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে। আবার বাজেট ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক অর্থায়নের শেয়ার গত অর্থবছরের ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এবার ৪৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক সহায়তার অর্থছাড় করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত কয়েক বছরের রাজস্ব আদায়ের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন হবে, যা প্রায় অসম্ভব।
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, তাঁর সরকারের লক্ষ্য ঘাটতি বাজেট অর্থায়নে ব্যাংক ঋণনির্ভরতা কমিয়ে আনা। নতুন অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনার ধারা শুরু হয়েছে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে ক্রমান্বয়ে সরকার বেরিয়ে আসবে। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
আমির খসরু মাহমুদ বলেন, ব্যাংক ঋণের নির্ভরতা কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং টেকসই অর্থায়ন কাঠামো তৈরির দিকে সরকার এগোচ্ছে। সরকার এখন বন্ডের মতো বিকল্প অর্থায়নের পথে হাঁটতে চায়। তবে মনে রাখতে হবে, বর্তমান সরকার একটি বিশাল ঋণের বোঝা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে এবং আগামী অর্থবছরে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা কেবল ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজেট করতে মাত্র দেড় মাস সময় পেয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যবসার খরচ ও হয়রানি কমাতে অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বাজেট অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় যুব কর্মসংস্থানের জন্য স্ট্যার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের নানা সুযোগ-সুবিধা বাজেটে ঘোষণা করেছেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সংকট রয়েছে। শিক্ষার গুণগত মানের সংকট রয়েছে। তিনি বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন, যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করে অর্থায়ন সহজ করা যায়। বাজেট অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে প্রতি তিন মাস অন্তর অগ্রগতি মনিটরিং ও বাস্তবায়ন রোডম্যাপ প্রকাশের প্রস্তাব দেন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ রাজ্জাক ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার কর চালুর সুপারিশ করেন। বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ মনে করেন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন ব্যাহত হলে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের আয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী জ্বালানি খাত প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি তো তিন মাসে এসব সমস্যা সমাধান করতে পারব না। টাকা দিয়েও এত দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান হবে না। বিগত সরকার গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ না নিলেও বর্তমান সরকার তা শুরু করেছে। বাইরে থেকে গ্যাস এনে সংরক্ষণ করে সরবরাহ করতে অন্তত ১৮ মাস সময় লাগবে।’
ব্যবসাকে সহজ করতে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে আমির খসরু বলেন, ব্যবসা সহজ করতে নিয়মকানুন সহজ করার সিদ্ধান্ত যেন সবাই ঠিকভাবে মেনে চলে, সে জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ওয়েবসাইট করা হচ্ছে। এই নিয়মকানুন ভঙ্গের বা সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় কোনোভাবে কেউ হয়রানির শিকার হলে ওয়েবসাইটে জানাতে পারবেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া একটি ‘ভঙ্গুর’ অর্থনীতি শক্তিশালী করতে সরকার প্রকল্পগুলোকে পুনর্বিন্যাস করছে এবং উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে ও পরিচালন ব্যয় কমিয়ে একটি গুণগত পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাজেট ও নির্দিষ্ট সময়সীমা কেন ধরে রাখা যাচ্ছে না, তার সমাধান নিয়ে বর্তমানে কাজ চলছে।
এনসিপির সংসদ সদস্য আকতার হোসেন বাজেটের বিশাল ঘাটতি এবং এনবিআরের ওপর রাজস্ব আদায়ের বিশাল বোঝা চাপিয়ে দেওয়াকে ‘অবাস্তব’ বলে সমালোচনা করেন।
