রপ্তানির ২৬ গুণ আমদানি
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬ | ১০:২৩
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে ভলিউম বা পরিমাণের দিক থেকে চীন ও ভিয়েতনামকে ছাড়িয়ে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এই বিপুল পরিমাণ পোশাক উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বড় অংশই আমদানি করতে হয়। আমদানি উৎস হিসেবে চীনের অবস্থান নিরঙ্কুশ। রপ্তানিমুখী শিল্পের মোট কাঁচামালের প্রায় অর্ধেক আসে দেশটি থেকে।
বিশেষ করে ওভেন পোশাকের সুতা-কাপড় কিংবা রাসায়নিকসহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে চীনই এখন বড় ভরসা। শিল্পের ভারী যন্ত্রপাতি থেকে দাঁতের খিলানসহ সব পণ্যই আমদানি হয় দেশটি থেকে। বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ হয় চীন থেকে। তবে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি নিতান্ত নগণ্য। মোট রপ্তানির ২ শতাংশেরও কম।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের চীন সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে কিছুটা অগ্রগতি আশা করছেন দেশের উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকরা। সফরে এ-সংক্রান্ত ১৩টি সমঝোতা (এমওইউ) ও দুটি চুক্তি ও একটি প্রটোকল সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে চীনের জন্য আরও দুটি বিশেষ বাণিজ্য অঞ্চল নির্মাণ, ২০টি বৃত্তিমূলক কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশে চীনা ব্যাংক স্থাপন, প্রযুক্তি সহায়তা ইত্যাদি সম্পর্কিত বিষয় রয়েছে। ৪ দিনের চীন সফর আগামীকাল শুরু হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর চীন থেকে এক হাজার ৮২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুারোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ওই অর্থবছর বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি এক হাজার ৭৫১ কোটি ডলার। বাংলাদেশ চীনে যে পরিমাণ রপ্তানি করে তার ২৬ গুণেরও বেশি আমদানি করে দেশটি থেকে।
বাংলাদেশের পণ্য চীনা বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এই সুবিধা কার্যকর হয়েছে। ২০২০ সাল পর্যন্ত ৯৭ শতাংশ পণ্যে ও ২০২২ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যসহ আরও কিছু নতুন পণ্য যুক্ত করে ৯৮ শতাংশ পণ্যে এই সুবিধা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চীন-আফ্রিকা ফোরামের সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সব স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) জন্য এই শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার ঘোষণা দেন।
ইপিবির পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত গত ১১ মাসে চীন ৭৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য, যা ওই সময়ের মোট রপ্তানি আয়ের মাত্র ১ দশমিক ৭০ শতাংশ। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে এই আয় ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছর রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চীনে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৭১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার।
চীনে বেশি রপ্তানি হয় পাট এ পাটজাত পণ্য। চলতি অর্থবছরের গত ১১ মাসে ১৩ কোটি ডলারের মতো রপ্তানি হয়েছে এই পণ্য। নিট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ছয় কোটি ৩৫ লাখ ডলারের। হোম টেক্সটাইল রপ্তানি হয়েছে ৮০ লাখ ডলারের কিছু কম। চামড়া ও চামড়া পণ্য সাত কোটি ডলারের কিছু বেশি। পাদুকা রপ্তানি এক কোটি ৪৯ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি আমদানি করে থাকে চীন থেকে। চীন থেকে আমদানি করা প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে শিল্প ও উৎপাদন খাতের কাঁচামাল, তৈরি পোশাকের ফেব্রিক্স, সুতাসহ প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পণ্য, শিল্পের ভারী যন্ত্রপাতি ও ক্যাপিটাল মেশিনারিজ, রাসায়নিক ও সার, বড় অবকাঠামো নির্মাণের ভারী যন্ত্রপাতি ও স্টিল, বৈদ্যুতিক ও সব ধরনের ভোক্তাপণ্য।
শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও চীনে কেন রপ্তানি বাড়ছে না জানতে চাইলে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম গতকাল সমকালকে বলেন, চীন সুবিধা দিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গাফিলতি আছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার পর এই সুবিধা কাজে লাগাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ইপিবি কিংবা বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এমনকি রপ্তানিকারকদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কোন পণ্যের চাহিদা বেশি চীনা ভোক্তাদের কাছে সে বিষয়ে কোনো গবেষণা নেই। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত ১০ জুন চীনের কুনমিং শহরে অনুষ্ঠিত চীন-দক্ষিণ এশিয়া প্রদর্শনীতে বাংলাদেশকে বিনা মূল্যে ১০০ স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সেখানে রপ্তানিযোগ্য মূলধারার কোনো পণ্য প্রদর্শন করেনি। সাধারণ হস্তশিল্প পণ্য নিয়ে গেছে সেখানে। শুধু নকশিকাঁথার স্টলই ছিল ২০টি। এ রকম প্রস্তুতি নিয়ে চীনের মতো স্পর্শকাতর বাজার ধরার কোনো সুযোগ নেই। চীনে রপ্তানি বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল নেওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলে আশা করেন তিনি।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র
- রপ্তানি
