খেলাপি কমাতে বিশেষ এক্সিট নীতিমালা
আয় খাতে নেওয়া সুদও মাফ করতে পারবে ব্যাংক
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০০:৩৭
ব্যাংক খাতের রেকর্ড খেলাপি ঋণ কমাতে একের পর এক ছাড় দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সোমবারের এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে– কোনো খেলাপি গ্রাহক পুরো ঋণ একবারে পরিশোধ করলে আয় খাতে নেওয়া সুদও মওকুফ করা যাবে। এক্ষেত্রে তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের চেয়েও এক্ষেত্রে বেশি সুদ মাফ করা যাবে।
সোমবার খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ এক্সিট সংক্রান্ত এক নীতিমালার মাধ্যমে এ ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকগুলোর কোনো ঋণ নিয়মিত থাকলে আদায় হোক বা না হোক সুদ আয় খাতে নেওয়া হয়। আর একটি ব্যাংকের আয় থেকে সব ধরনের খরচের পর পরিচালন মুনাফা দেখিয়ে থাকে। একশ টাকা পরিচালন মুনাফা থেকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের পর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একটি ব্যাংক সাড়ে ৩৭ শতাংশ সরকারকে কর পরিশোধ করে। তালিকাভুক্ত নয় এরকম ব্যাংকের পরিশোধ করতে হয় ৪০ শতাংশ।
গতকালের সার্কুলারে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য ২০২৬ সালের ৩০ জুনভিত্তিক মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত ঋণ পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নিয়ে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে বিশেষ এক্সিট দেওয়া যাবে। তবে এ সুবিধা পেতে এক্সিট সুবিধার আওতায় ঋণগ্রহীতাকে সমুদয় দায় এককালীন পরিশোধ করতে হবে। এ সুবিধার আওতায় ঋণগ্রহীতার সব আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে তহবিল ব্যয় আদায় নিশ্চিত করার যে শর্ত ছিল তা শিথিল থাকবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের আয় খাত বিকলন করে সুদ মওকুফ করা যাবে না বলে যে নির্দেশনা রয়েছে তা শিথিল থাকবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী বিশেষ পুনঃতপশিল পাওয়া ঋণেও এ সুবিধা দেওয়া যাবে। বিশেষ এক্সিটের ক্ষেত্রে স্বল্প মেয়াদি কৃষি ঋণ ও সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও স্মল ঋণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ সার্কুলারে বর্ণিত বিশেষ এক্সিটের বিষয়ে ঋণগ্রহীতাদের অবহিত করতে ব্যাংক থেকে চিঠি দেওয়াসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এ সার্কুলারের নির্দেশনা ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে– কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বিরূপভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। যে কারণে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমানো অত্যাবশ্যক। এ প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন কারণে আর্থিক সংকটে পড়লেও ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের আন্তরিকতা রয়েছে এমন ঋণগ্রহীতাদের এককালীন বিশেষ এক্সিট সুবিধা দিলে একদিকে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমবে। নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে। উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী– গতবছর ব্যাংকগুলো রেকর্ড এক লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতপশিল করেছে। এরপরও বেশিরভাগ সূচকের অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সাল শেষে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ বেড়ে ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকায় ঠেকেছে। মোট ঋণের যা ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। একবছর আগে দুর্দশাগ্রস্ত ঋণ ছিল ৭ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এক বছরে বেড়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। গতবছর শেষে ব্যাংক খাতের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হিসেবে দেখানো হয় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। পুনঃতপশিলের পর অনাদায়ী স্থিতি ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা। আর অবলোপন করা অনাদায়ী স্থিতি রয়েছে ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্দশাগ্রস্ত এসব ঋণের বড় অংশই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সৃষ্ট। তবে ওই সময় এসব ঋণ কৌশলে নিয়মিত দেখানো হয়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে প্রকৃত চিত্র দেখাতে শুরু করে। আবার অনিয়ম জালিয়াতিতে সম্পৃক্ত প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের অনেকেই পালিয়েছেন। কেউ কেউ জেলে আছেন। সেসব ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপি হওয়ায় পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে।
- বিষয় :
- সুদ মওকুফ
- বাংলাদেশ ব্যাংক
