ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর  প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে টেকসই ও নির্বিঘ্ন উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সুপারিশ চেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছে। 

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ইকোসকের বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেয়। বুধবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নেপালের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন সম্পর্কেও একই ধরনের সুপারিশ করেছে ইকোসক।

বৈঠকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধের পটভূমি, প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল অপরিহার্য।

বাংলাদেশ সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণের আবেদন জানায়। পরে গত ৬ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এক চিঠিতে এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের ব্যক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন। জুনে সিডিপি বাংলাদেশের আবেদনকে সমর্থন জানালেও প্রস্তুতিকাল কত দিনের জন্য বাড়ানো উচিত, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সুপারিশ করেনি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, ইকোসক বাংলাদেশের তিন বছর সময় বাড়ানোর আবেদনটি বিবেচনার জন্য সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠিয়েছে। তবে তারা নির্দিষ্টভাবে তিন বছর সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেনি। বরং কত দিনের জন্য প্রস্তুতিকাল বাড়ানো হবে, সেই সিদ্ধান্ত সাধারণ পরিষদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে সিডিপির সমর্থনসংবলিত প্রতিবেদনও পাঠিয়েছে ইকোসক। 
বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ও নেপালের আবেদন পর্যালোচনা করে সিডিপিও বিষয়টি সাধারণ পরিষদে উপস্থাপনের মত দিয়েছিল। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই আগামী ২৪ নভেম্বরের আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সাধারণ পরিষদকে অনুরোধ করেছে ইকোসক। বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি থেকে উত্তরণের বর্তমান নির্ধারিত তারিখ ২৪ নভেম্বর।
রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এলডিসি থেকে বাংলাদেশের টেকসই উত্তরণের প্রতি সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদ প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ ও সংস্কার বাস্তবায়নের পাশাপাশি এলডিসি-উত্তর সময়ের জন্য দেশের প্রস্তুতি আরও সুদৃঢ় করবে।
মন্তব্য জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার সমকালকে বলেন, ইকোসক যদি সরাসরি তিন বছর প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর সুপারিশ করত, তাহলে বাংলাদেশের জন্য আরও ইতিবাচক হতো। এখন তিন বছর সময় দেওয়া হবে কিনা, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। 

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির কথা বলা হলেও বাণিজ্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার খুবই সীমিত। উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। সেই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাণিজ্য ও শুল্কনীতিতে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি অত্যন্ত কম। তাঁর ভাষায়, প্রয়োজনীয় সংস্কারের মূল্যায়ন করলে ১০০ নম্বরের মধ্যে ১০ নম্বরও পাওয়া যাবে না। 

ড. জাইদি সাত্তার আরও বলেন, এখন বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ জি-৭৭ভুক্ত দেশগুলোর একটি বড় অংশ বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করছে। এ কারণে তিনি আশাবাদী। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ একের পর এক বৈশ্বিক ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছে এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিও বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এমন বাস্তবতায় একটি এলডিসিকে দ্রুত উত্তরণের চাপ দেওয়া সমীচীন হবে না। একই প্রক্রিয়ায় নেপালও রয়েছে। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশের অনুকূলে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সরকারের পরিকল্পনা 
অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তুতিকাল ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আবেদন অনুমোদিত হলে ২০২৬-২৯ মেয়াদে অন্তত ২৫টি সংস্কার ও প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বাণিজ্য, আর্থিক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিতে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে অগ্রাধিকারভিত্তিতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পন্ন করা হবে। ব্যাংক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা জোরদার, সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়ন এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজস্ব খাতে করের আওতা সম্প্রসারণ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণ, কর তথ্যভান্ডারের ডিজিটাল সংযোগ, কর অব্যাহতি যৌক্তিক করা এবং ভ্যাট ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যবসা সহজ করতে একক ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, সাত দিনের মধ্যে প্রাথমিক লাইসেন্স প্রদান, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং ‘বাংলাবিজ’ ওয়ান-স্টপ সেবা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে।
তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাট ও হালকা প্রকৌশল খাতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, শিল্প অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর আধুনিকায়ন, শুল্ক সংস্কার এবং জাতীয় লজিস্টিকস নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবহন ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, পরিবেশ ও শ্রমমান উন্নয়ন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জনের প্রস্তুতি, ওষুধ খাতকে ডব্লিউটিওর মেধাস্বত্ব অব্যাহতি-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রস্তুত করা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়, সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, দুর্নীতি দমন এবং মন্ত্রণালয়ভিত্তিক নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×