ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

সমকাল এক্সপ্লেইনার

জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক কী, বাংলাদেশের ওপর কেন আরোপ, কোন খাতে প্রভাব পড়বে?

জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক কী, বাংলাদেশের কোন খাতে প্রভাব পড়বে?
×

বাংলাদেশেসহ ৬০টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ছবি: এএফপি/ ইলাস্ট্রেশন: সমকাল

সাদিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৫২ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১৮:০৭

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ওপর নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যেটিকে ‘জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক’ বলা হচ্ছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) বলছে, পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে বাংলাদেশ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বাণিজ্য আইনের আওতায় এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশ ও অঞ্চলের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) ওপর এই শুল্ক কার্যকর হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা বেশিরভাগ পণ্যের ওপর এই শুল্ক বসবে। তবে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য আওতামুক্ত থাকবে। আবার শর্ত সাপেক্ষে ট্যারিফ রেট কোটা (টিআরকিউ) বা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক কী?
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ঘোষণা অনুযায়ী, যখন কোনো ব্যক্তিকে প্রতারণা বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ বা সেবা দিতে বাধ্য করা হয়, তখন সেটি জোরপূর্বক শ্রম হিসেবে গণ্য হবে। সংস্থাটির অনুমান অনুযায়ী, ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ৭৬ লাখ মানুষ জোরপূর্বক শ্রমের শিকার হন। 

শুক্রবার সংস্থাটির ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ জোরপূর্বক শ্রমই সংঘটিত হয় বেসরকারি খাতে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর কোম্পানিগুলো ২৩৬ বিলিয়ন (২৩ হাজার ৬০০ কোটি) ডলার অবৈধ মুনাফা অর্জন করে। বর্তমানে ৬০টির মতো দেশ আইএলও’র শ্রম প্রোটোকল অনুমোদন দিয়েছে। যার মধ্যে বাংলাদেশও আছে।

আইএলও-এর প্রোটোকলটি যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এই আইনের ৩০১ নম্বর ধারার আওতায় গত মার্চ মাসে একটি তদন্ত শুরু করে দেশটি। সেখান থেকে এই নতুন শুল্ক ধারণার উৎপত্তি। ৩০১ নম্বর ধারাটি মার্কিন সরকারকে অন্য কোনো দেশের বাণিজ্য পদ্ধতি জবরদস্তিমূলক, অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি না তা তদন্ত করার ক্ষমতা দেয়। এই তদন্তের পর প্রয়োজন হলে দেশটি অন্যদের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক শুল্ক ব্যবস্থা আরোপ করতে পারে।

সম্প্রতি এই তদন্ত শেষে শুক্রবার মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর তাদের ওয়েবসাইটে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ৬০টি দেশ ও অঞ্চলের ওপর জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক আরোপের কথা আছে। 

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৩০১ ধারা প্রয়োগ করে আরোপ করা শুল্কের মেয়াদ শেষের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই। তদন্ত শেষে সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, অন্যায্য বাণিজ্য পদ্ধতি ও মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগ থেকে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। 

গ্রিয়ার বলেন, আজকের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অন্যায্য বাণিজ্য পদ্ধতির সংশোধন শুরু করবে। এটি শ্রমিকদের কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য জরুরি।

বাংলাদেশ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে
গত মার্চ মাসে ইউএসটিআর বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্তের ঘোষণা দেয়। তারা মূলত, পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার থাকলে, সেই পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইন ও নীতির বাস্তব প্রয়োগ খতিয়ে দেখতে চেয়েছে।

তদন্ত শেষে ইউএসটিআর যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে, সেখানে ‘বাংলাদেশ: ডিটারমিনেশন অব অ্যাকশন ইন ইনভেস্টিগেশন’ নামে আলাদা একটি অনুচ্ছেদ আছে। এতে বলা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির (এআরটি) অধীনে থাকা বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অর্থ্যাৎ, এআরটির বাধ্যবাধকতা মেনে বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর যথেষ্ট নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারেনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জনসাধারণের মন্তব্য ও সাক্ষ্য, সেকশন-৩০১ সংক্রান্ত কমিটির পরামর্শ, উপদেষ্টা কমিটিগুলোর পরামর্শ এবং প্রেসিডেন্টের (ডোনাল্ড ট্রাম্প) নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে ব্যতিক্রম কিছু পণ্য শুল্ক অব্যাহতি পাবে। 

কোন পণ্য শুল্কমুক্ত?
ইউএসটিআর-এর প্রতিবেদনের দুটি সংযুক্তিতে শুল্কের আওতামুক্ত প্রায় ৮৫টি পণ্যের তালিকা আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- নির্দিষ্ট কিছু শুকনো লতাগুল্ম ও উদ্ভিজ্জ উপাদান, ইসবগুলের ভুসি, নির্দিষ্ট কিছু ভেষজ নির্যাস, বাঁশের সামগ্রী, ক্যাস্টর অয়েল, নির্দিষ্ট ধরনের সেগুন এবং মেহগনি কাঠের তৈরি বিভিন্ন পণ্য। এ ছাড়া, নির্দিষ্ট কিছু সিল্ক ফ্যাব্রিক ও রত্নপাথর শুল্ক অব্যাহতি পাবে।

কোন খাত বেশি প্রভাবিত হবে?
নতুন শুল্কের কারণে বাংলাদেশের বস্ত্র ও পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বস্ত্র ও পোশাক শুল্কমুক্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ‘ট্যারিফ-রেট কোটা (টিআরকিউ)’ ব্যবস্থা চালু করা হতে পারে। এটি নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটুকু মার্কিন তুলা ও টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানি করছে সেটির ওপর। 

ইউএসটিআর বলেছে, এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো- জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকি আছে এমন অন্য উৎস থেকে কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ যেন মার্কিন কাঁচামাল ব্যবহার করে। তবে যতদিন এই কোটা ব্যবস্থা চালু না হচ্ছে, ততদিন বস্ত্র ও পোশাকের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর থাকবে।

বাংলাদেশের পাশাপাশি ‘টিআরকিউ’ সুবিধা পাওয়ার উপযোগী হিসেবে কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রতিযোগীদের ওপর শুল্কের হার কত?
যুক্তরাষ্ট্র মূলত দুটি বিষয় বিবেচনা করে পৃথক হারে শুল্ক আরোপ করেছে। যেসব দেশ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যেসব দেশকে বাংলাদেশের প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেগুলোর মধ্যে ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় থাকবে। 

অন্যদিকে যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি, তাদের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই তালিকায় আছে বাংলাদেশের অত্যন্ত শক্তিশালী দুই প্রতিযোগী দেশ- চীন ও ভিয়েতনাম। এছাড়া, থাইল্যান্ড, তুরস্ক ও ফিলিপাইনের ওপরও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে।

সরকারের প্রতিক্রিয়া কী?
শুক্রবার এক প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ হারের কারণে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডসহ পোশাক রপ্তানিতে প্রধান প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থান ধরে রাখতে পারবে। 

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, প্রতিযোগীদের তুলনায় এই শুল্কের ব্যবধান যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধাকে আরও শক্তিশালী করবে। কারণ প্রতিযোগীরা বেশি হারে শুল্কের মুখোমুখি হচ্ছে।

এদিকে সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, পূর্বঘোষিত ১৫০ দিনের একটি শুল্কহারের (১০%) মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নামে একই শুল্ক পুনর্বহাল করা হয়েছে। এটি মূলত পুরোনো শুল্কেরই একটি ‘রিপ্লেসমেন্ট’ বা প্রতিস্থাপন। কোনো অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হয়নি। ফলে শুল্ক পরিস্থিতিতে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসছে না।

যুক্তরাষ্ট্র কতটা লাভবান হবে?
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসে গত বছর আমদানিকৃত পণ্যের ওপর একতরফাভাবে পারস্পরিক শুল্ক আরোপ করেন ট্রাম্প। এ নিয়ে আইনি লড়াইয়ের পর গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট অতিরিক্ত শুল্কের বড় অংশ বাতিল করেন। এরপর অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয় হোয়াইট হাউস। যেটির মেয়াদ শুক্রবার শেষ হয়েছে। 

তবে এর আগেই শুল্ক থেকে আয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে পুরোনো এক বাণিজ্য আইন নতুন করে প্রয়োগের কৌশল নেয় ট্রাম্প প্রশাসন। সেটিই হলো এবারের জোরপূর্বক শ্রম শুল্ক। 

দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন পারস্পরিক শুল্ক বাবদ আদায়কৃত অর্থের মধ্যে ৮১ বিলিয়ন ডলার ফেরত দিয়েছে। শুরুতে পাল্টা শুল্ক থেকে থেকে আসা আয়ের কারণে গত বছর দেশটির বাজেট ঘাটতি কিছুটা কমলেও এখন তা বাড়ছে। গত অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে ঘাটতির পরিমাণ ২ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৬৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। নতুন আরোপ করা শুল্কের আয় থেকে সে ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

×