ফিকির এফডিআই প্রতিবেদন
বিনিয়োগ সক্ষমতার বেশির ভাগ সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে
ছবি-সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) অর্থনীতির রূপান্তরের শক্তিশালী হাতিয়ার। এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের সামনে এখন এফডিআই আকর্ষণই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) তাদের ‘এফডিআই রিপোর্ট-২০২৬’ এ এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ফিকি আয়োজিত এফডিআই সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি ছিলেন।
প্রতিবেদনে ফিকি উল্লেখ করেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক ১৫ বিলিয়ন ডলার প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব। বর্তমানে বাংলাদেশে এফডিআই আসছে দুই বিলিয়ন ডলারেরও কম। এ ছাড়া এফডিআই-জিডিপি অনুপাত মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা ২০৩০ সালের মধ্যে আড়াই শতাংশে উন্নীত করার কথা বলছে ফিকি।
আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
প্রতিবেদনে বিনিয়োগ সক্ষমতার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, লজিস্টিকস, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, শিল্পনীতি, বাণিজ্য একত্রীকরণ এবং করব্যবস্থা– এই ছয় প্রধান সূচকের মধ্যে পাঁচটিতেই বাংলাদেশের অবস্থান ‘দুর্বল’।
লজিস্টিকস ও বাণিজ্য সহজীকরণ সূচকে ভারত ও ভিয়েতনাম ‘শক্তিশালী’ অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ ‘দুর্বল’, যেখানে ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া ‘মধ্যম’ পর্যায়ে আছে। লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্সে ভারতের অবস্থান ৩৮তম এবং ভিয়েতনামের ৪৩তম হলেও বাংলাদেশ ৮৮তম স্থানে।
বিনিয়োগকারী সুরক্ষা ও নিয়ন্ত্রক সুশাসন সূচকে ভিয়েতনাম ও ভারত ‘শক্তিশালী’ অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ ‘দুর্বল’। ভিয়েতনামের ২০২০ সালের আধুনিক বিনিয়োগ আইনের বিপরীতে বাংলাদেশ এখনও ১৯৮০ সালের পুরোনো ‘এফপিআইপিপিএ’ আইনের ওপর নির্ভর করছে।
শিল্পনীতির ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ‘শক্তিশালী’ এবং ভারত ও ইন্দোনেশিয়া ‘মধ্যম’ অবস্থানে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রেও ‘দুর্বল’ অবস্থানে। শিল্পে উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভারত বা ভিয়েতনামের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বাণিজ্য একত্রীকরণ ও এফটিএ নেটওয়ার্ক সূচকে ভিয়েতনাম ‘শক্তিশালী’। বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া ‘দুর্বল’। বাণিজ্য উন্মুক্ততা সূচকে ভিয়েতনামের অবস্থান ১৩তম হলেও বাংলাদেশ ১৫৫তম স্থানে রয়েছে।
একইভাবে বিনিয়োগ প্রণোদনা ও করব্যবস্থা সূচকে ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া ‘মধ্যম’ অবস্থানে থাকলেও বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া ‘দুর্বল’ অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে কার্যকর করহার ৪৩ থেকে ৪৮ শতাংশ, যা বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে আছে।
একমাত্র অর্থনৈতিক অঞ্চলের সক্ষমতা সূচকেই বাংলাদেশ ‘মধ্যম’ অবস্থানে থেকে কম্বোডিয়ার সমকক্ষ হতে পেরেছে। যদিও ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি ‘শক্তিশালী’ অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনামে ৪৪টি এবং ভারতে ২৭৬টি কার্যকর অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকলেও বাংলাদেশে এ সংখ্যা এখনও ১০টি।
এফডিআই বদলে দিতে পারে অর্থনীতি
ফিকির মতে, এফডিআই আকর্ষণ করা গেলে কেবল বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়াবে না, বরং এটি প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এটি দেশের শিল্প খাতের বৈচিত্র্যকরণে সাহায্য করবে, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়াবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের ঝুঁকি কমাতে এফডিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা এবং মানদণ্ড শিখতে সাহায্য করবে, যা প্রকারান্তরে দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশেরই উন্নয়ন ঘটাবে।
কোন খাতে আসতে পারে বিনিয়োগ
ফিকির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথাগত তৈরি পোশাক খাতের বাইরেও ওষুধ শিল্প, আইটি ও ডিজিটাল সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং হালকা প্রকৌশল খাতে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং চামড়াজাত পণ্য খাতও বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ছে।
বিনিয়োগের উৎস হিসেবে বর্তমানে নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য, চীন, সিঙ্গাপুর, ভারত এবং দক্ষিণ কোরিয়া শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও, ভবিষ্যতে আসিয়ান সদস্য দেশগুলো এবং জাপানের মতো দেশগুলো থেকে বড় বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে জাপানিজ ইকোনমিক জোন এবং কোরিয়ান বিনিয়োগকারীদের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে এফডিআইর নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
- বিষয় :
- ফিকি