ব্যাংকে উদ্বৃত্ত তারল্য, ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার কমছে
ছবি: সমকাল ইপেপার
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১২ | আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলোর কাছে উদ্বৃত্ত তহবিল বাড়ছে। এ সময়ে আয় বাড়াতে সরকারি বিল-বন্ডে টাকা খাটানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে অনেক ব্যাংক। আবার সময়মতো টাকা ফেরত পাওয়াসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষেরও আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারি এ উপাদান। এর মধ্যে প্রধান নীতি সুদহার রেপোর সুদহার বেসিস পয়েন্ট ৫০ কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার দ্রুত কমছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিনিয়োগ না হওয়ার পেছনে এখন সুদহারের চেয়ে বড় সমস্যা সার্বিক পরিস্থিতি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নানা কারণে অনেকেই বিদ্যমান কারখানা চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন বিনিয়োগে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভর্তুকি সুদে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কম সুদের এ ঋণেও সাড়া নেই। সামগ্রিকভাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমেছে। গত জুন পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার ১২ শতাংশ বিবেচনায় নিলে প্রকৃত পক্ষে যা ঋণাত্মক। এর মধ্যে গত ২ আগস্ট থেকে সুদহার কমানো হয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, বিনিয়োগ করার মতো সুযোগ না থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে এখন উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে। অনেক ব্যাংক মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ সুদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি বা এসডিএফে টাকা রাখছে। আর বিল-বন্ডের নিলাম সুদ কমিয়ে বিড দাখিল করছে। ফলে বিল-বন্ডের সুদহার কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়তো ঋণের সুদহার কমানোর জন্য নীতি সুদহার কমিয়েছে। তবে অন্যান্য বিষয় ঠিক না করে কেবল সুদহার কমালে ঋণ চাহিদা বাড়বে না; বরং এর প্রভাবে আমানতের সুদহার আরও কমবে। এমনিতেই ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে না পারায় ঋণের সুদহার কমাচ্ছে। সুদহার কমানো ছাড়া ব্যাংক তো আর বলতে পারবে না, আমানত নেব না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের নিলামে পাঁচ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার। মাত্র ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ সুদে এ অর্থ নেওয়া হয়। ঠিক এর আগের নিলাম গত ৮ জুলাই একই মেয়াদের ট্রেজারি বন্ডে চার হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছিল ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ সুদে। আর গত জুনে এ ক্ষেত্রে সুদহার ছিল ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ। গত বছরের জুনে যা ছিল ১২ দশমিক ২০ শতাংশ।
একইভাবে গত বৃহস্পতিবার তিন বছর মেয়াদে ৫০০ কোটি টাকা তোলা হয় ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে। আগের নিলাম গত ৮ জুলাই এ ক্ষেত্রে সুদহার ছিল ১০ দশমিক ১০ শতাংশ। আর গত জুনে যা ১০ দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল। গত বছরের জুনে সুদহার ছিল ১৩ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ।
শুধু বন্ড নয়; ট্রেজারি বিলের সুদহারও দ্রুত কমছে। গত ৩ আগস্ট ৯১ দিন মেয়াদি বিলের বিপরীতে সরকার তিন হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। যেখানে সুদহার নেমেছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে আড়াই হাজার কোটি টাকা এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে দুই হাজার কোটি টাকা নিয়েছে ৯ দশমিক ৫৩ শতাংশ সুদে।
গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহের নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি বিলে ৯ দশমিক ৭৯, ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ৯ দশমিক ৯৯ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে সুদহার ছিল ১০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। গত বছরের জুনে ৯১ দিন মেয়াদি বিলে গড়ে ১১ দশমিক ৯৪ শতাংশ, ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলে সুদহার ছিল ১২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও অন্যান্য ক্ষেত্রের আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় সাড়া মিলছে না। আবার উচ্চ খেলাপির কারণে যেনতেন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা দেখাচ্ছে। এ সময়ে উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে বিল-বন্ডে। এর ফলে ব্যাংক খাতে এখন তিন লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকার মতো উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে।
তিনি বলেন, কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। এ প্রবণতা আমানত রাখার ক্ষেত্রে সুদহারের পাশাপাশি যথাসময়ে ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তার বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একটি সময় কেবল সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও এখন বিল-বন্ডের দিকে ঝুঁকেছে। যে কারণে সব দিক থেকে চাপ তৈরি হয়ে সুদহার এভাবে কমছে।