অর্থনীতিতে সাহসী সংস্কার শুরু করতে হবে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতি এক জটিল মহাসড়কের মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। টেকসই রূপান্তরের জন্য দ্রুত সমন্বিত ও সাহসী পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষত স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে নিষ্ক্রিয় থাকা চলবে না। বাণিজ্যনীতি সংস্কার, শুল্ক যৌক্তিকীকরণ ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে এখনই সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার বিশ্বব্যাংক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক কর্মশালায় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা এমন মত দিয়েছেন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ইকোনমিস্ট ড. নোরা ডিহেল। তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মোস্ট ফেভার্ড ন্যাশন (এমএফএন) শুল্ক ৭ শতাংশ থাকলেও নিয়ন্ত্রণ ও সম্পূরক শুল্কের মতো প্যারা-ট্যারিফের কারণে সীমান্ত সুরক্ষার হার বেড়ে ১৫ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ড. নোরা একটি তিন-ধাপের শুল্ক সংস্কার প্রস্তাব করেন, যার প্রথম ধাপে উপকরণের শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি উচ্চ সুরক্ষিত ভোগ্যপণ্যের শুল্ক কমানো, দ্বিতীয় ধাপে অবশিষ্ট প্যারা-ট্যারিফ প্রত্যাহার এবং তৃতীয় ধাপে আঞ্চলিক প্রতিযোগী দেশগুলোর শুল্ক হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার বিষয়টি রয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) দীর্ঘমেয়াদে বড় সুফল নিয়ে আসতে পারে।
পিআরআইর চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, অর্থনীতি এখন এমন একটি জটিল সন্ধিক্ষণে যেখানে কিছু না করে বসে থাকার সুযোগ নেই। দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার এখন শুরু করতে হবে। সংস্কারের জন্য শুরুতে কিছুটা মূল্য দিতে হতে পারে, তবে সংস্কার নিজেই তার মূল্য পুষিয়ে নেবে। তিনি বলেন, উচ্চ শুল্কপ্রাচীরের আড়ালে গড়ে ওঠা অভ্যন্তরীণ বাজার রপ্তানির চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক হওয়ায় নন-আরএমজি রপ্তানিকারকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। মধ্যবর্তী পণ্যের শুল্ক কমানোর সঙ্গে যদি চূড়ান্ত উৎপাদিত পণ্যের শুল্ক না কমানো হয়, তবে কার্যকর সুরক্ষা আরও বাড়বে, যা রপ্তানি বহুমুখীকরণকে বাধাগ্রস্ত করবে। ড. সাত্তার ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রক শুল্ক পুরোপুরি বিলোপ করার প্রস্তাব করে প্রথম ধাপে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার এবং দ্বিতীয় ধাপে কাস্টমস ডিউটি ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার রূপরেখা দেন।
কর্মশালার প্রধান অতিথি এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, কেবল শুল্ক সংস্কার বা কৃত্রিম প্রশাসনিক উপায়ে ল্পকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা যায় না। এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য ব্যবসায়ী সমাজকে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিরাপত্তা, উন্নত অবকাঠামো এবং সহজ অর্থায়নের সুবিধা দিতে হবে এবং এফটিএর বিষয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা নিশ্চিত করতে হবে।
পিআরআইর সম্মানীয় ফেলো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, শুধু সংকীর্ণ বাণিজ্যনীতি দিয়ে অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্ভব নয়। আগামী পাঁচ বছরে কাস্টমস ডিউটি ধাপে ধাপে বিলোপ করার সাহসী প্রস্তাব দিয়ে বলেন, এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের কোনো ক্ষতি হবে না। কাস্টমস তিন বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারাতে পারে। এই তিন বিলিয়ন ডলার শুল্ক সংগ্রহের পেছনে ব্যবসায়ীদের যে হয়রানি পোহাতে হয় তার পরোক্ষ মূল্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের সমান। শুল্ক বিলোপ হলে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক গতিশীলতার মাধ্যমে ১৩ বিলিয়ন ডলার নতুন রাজস্ব সৃষ্টি করা সম্ভব।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন শুল্ক সংস্কারের ক্ষেত্রে পণ্যভিত্তিক পার্থক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, তামাক ও বিলাসবহুল পণ্যে সম্পূরক শুল্কগুলো রাজস্ব বা সুরক্ষার জন্য নয়, বরং জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত কারণে যৌক্তিক।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, দেশে আমদানিনীতি সুরক্ষামূলক হলেও রপ্তানিনীতি ও বিনিময় হারনীতির সঠিক সমন্বয় না থাকায় এর কার্যকারিতা মিলছে না। র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, উন্নত দেশগুলো যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে শিল্প খাতে ভর্তুকি দিয়ে রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ রপ্তানি নগদ সহায়তা কমাচ্ছে, যা দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
ব্যবসায়ী সংগঠন এমসিসিআইর সভাপতি কামরান টি রহমান সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি ধীর, পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি পথনকশার ওপর জোর দেন। তিনি সতর্ক করেন, দ্রুত সংস্কারের ধাক্কা দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো সহ্য করতে পারবে না, যা দেশের বিশাল শ্রমবাজারে ভয়াবহ বেকারত্ব তৈরি করতে পারে।
ব্যবসায়ী সংগঠন বিসিআইর সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, শুল্ক সংস্কারের আগে ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয় ও এনবিআরের পদ্ধতিগত সংস্কার অত্যন্ত জরুরি।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের যুগে কেবল চুক্তি থাকলেই বিনিয়োগ আসবে না, যদি না আমাদের জনশক্তির দক্ষতা ও প্রযুক্তি আধুনিকায়ন করা যায়।
বিএফটিআইর সিইও ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, শুল্ক কমানো ও এফটিএর প্রতিশ্রুতিগুলোকে একে অপরের পরিপূরক হতে হবে, অন্যথায় দেশীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হতে চাইবেন না। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ বলেন, টেকসই রাজস্বের জন্য এনবিআর ও কাস্টমস প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সীমান্ত দুর্নীতির অবসান হওয়া উচিত।
- বিষয় :
- অর্থনীতি