সুতায় বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারে কারও আপত্তি, কেউ খুশি
ফাইল ফটো
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৫ | আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করেছে সরকার। এর প্রতিক্রিয়ায় টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে সুতার মূল ব্যবহারকারী তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা সরকারের এ সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী বলছেন। জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
রোববার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ জারি করে। এর আগে গত ২০ আগস্ট আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে ওই সভার কার্যবিবরণীতে জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বস্ত্র খাতের সমস্যা সমাধানে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং বস্ত্র ও পোশাক খাতের তিন সংগঠনের সভাপতিরা রয়েছেন কমিটিতে। তবে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ সভাপতি বলেছেন, ওই সভায় এ ধরনের সিদ্ধান্ত হয়নি।
এনবিআর আদেশে বলা হয়, আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আমদানির শর্ত হিসেবে বস্ত্র ও পোশাক খাতের তিন সংগঠন বিটিএমএ, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রত্যয়নপত্র সংশ্লিষ্ট কাস্টমস স্টেশনে দাখিলের কথা বলা হয়। আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ নিঃশর্ত ও অব্যাহত ব্যাংক গ্যারান্টি দাখিল করতে হবে। এ ছাড়া খালাস করা কাঁচামালে প্রস্তুত করা পণ্য সম্পূর্ণরূপে রপ্তানি হওয়া সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতে ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্তযোগ্য হবে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করেছে পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। গতকাল সংগঠন দুটির পক্ষ থেকে বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছে লেখা এক চিঠিতে বলা হয়, গত ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভার কার্যবিবরণীর সিদ্ধান্তের ‘ক’ অংশে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানির ক্ষেত্রে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে আমদানির কথা বলা হয়েছে। সিদ্ধান্তের ‘খ’ অংশে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুতার ন্যূনতম ৫০ শতাংশ স্থানীয় স্পিনিং মিল থেকে সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা এবং অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ সুতা আমদানির সুযোগ দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সভায় দুই সংগঠনের সভাপতি উপস্থিত ছিলেন এবং এমন কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়নি।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সভা শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে একটি আলোচনা উঠলে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএর যৌথ সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়কে জানালে সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানানো হয়। সভার আলোচনাবহির্ভূত এ ধরনের বিষয় সভার কার্যবিবরণীতে ‘সিদ্ধান্ত’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা তাদের বিস্মিত করেছে। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবতাবিরোধী ও আত্মঘাতী, যা বাস্তবায়িত হলে পোশাকশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। স্বার্থান্বেষী মহলকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিনের বন্ড ব্যবস্থাকে বাদ দেওয়া যাবে না। দেশের তৈরি পোশাকশিল্প এ বন্ড ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত বাদ দেওয়া হলে বিদেশি ব্র্যান্ড ক্রেতাদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। এতে পোশাক রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে রপ্তানি আদেশ কম। এ কারণে বাজারে সুতার চাহিদা তুলনামূলক কম থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় বাজারে এর দাম বাড়ছে। এতে বোঝা যায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল দেশে মনোপলি ব্যবসা করার জন্য পোশাক রপ্তানিকারকদের জিম্মি করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান ও বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম চিঠিতে সই করেন।
অন্যদিকে সরকারের সিদ্ধান্তকে দেশীয় বস্ত্র ও স্পিনিং খাতের পুনরুজ্জীবন বলছে টেক্সটাইল মিল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ। সংগঠনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, দেশীয় বস্ত্রশিল্প বিশেষ করে স্পিনিং খাতের সুরক্ষা ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে সরকারের এ সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। এতে দেশীয় বস্ত্র ও স্পিনিং খাতের পুনরুজ্জীবন হবে। স্থানীয় সুতার চাহিদা বাড়বে, বন্ধ ও আংশিক বন্ধ মিলগুলো পুনরায় সচল হবে, বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়বে। এ ছাড়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমবে।
বিটিএমএ মনে করে, আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য শুল্ক-করের সমপরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টি সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রত্যয়নপত্র দাখিল ও আমদানি করা কাঁচামালে উৎপাদিত পণ্য সম্পূর্ণরূপে রপ্তানির পর তা অবমুক্ত করার ব্যবস্থা রাখার ফলে আমদানি করা সুতা স্থানীয় বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি কমবে। সুতা আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর রপ্তানিতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানোর যে শর্তের কথা বলা হচ্ছে, তা পরিপালনও সহজ হবে।
প্রসঙ্গত, সুতা কতটুকু চিকন বা মোটা, তার ওপর এর কাউন্ট নির্ধারণ হয়। ১০ কাউন্টের সুতা মোটা এবং ৩০ কাউন্টের সুতা তুলনামূলক চিকন। বিভিন্ন কাউন্টের সুতা থাকলেও বাংলাদেশের পোশাক খাতে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতার ব্যবহার বেশি।
- বিষয় :
- সুতা
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
- বন্ড
- বস্ত্র খাত