ব্যাংকে খেলাপি ঋণ কমাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের ব্যাংক খাতে নিয়মনীতি, নৈতিকতা ও সুশাসনের গুরুতর অবক্ষয়ের কারণে এক ভয়াবহ ‘ব্ল্যাকহোল’ বা কৃষ্ণগহ্বর তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, আইনি মারপ্যাঁচ এবং বেনামি ঋণের প্রভাবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের রেকর্ড হয়েছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি। এটি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম মিলনায়তনে ‘ব্যাংক ব্যবস্থায় নৈতিকতা’ শীর্ষক ২৩তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতার মূল প্রবন্ধে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্ এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম।
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক মাহ্বুব উল্লাহ্ বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে ৩২ শতাংশের বেশি ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে। সাধারণ আমানতকারীদের কষ্টার্জিত টাকার প্রতি তিন টাকার এক টাকাই বাজারে আটকে গেছে। এই বিশাল সংকটের কারণে ব্যাংক খাতের মূল চালিকাশক্তি, অর্থাৎ তহবিলের ঘূর্ণায়মান চক্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে কোনো ব্যাংকের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জোরপূর্বক একীভূতকরণ বা দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। একদিকে ঋণ বিতরণের সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে; আরেকদিকে যেসব ব্যাংকের সক্ষমতা রয়েছে, তারাও ঝুঁকি এড়াতে নতুন ঋণ অনুমোদনে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। এর ফলে যোগ্য উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানও কার্যকর মূলধন বা নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছে না। উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে যা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। নিরাপদ বিবেচনায় ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ করায় সরকার ব্যাংক খাত থেকে সহজে ঋণ পেয়ে যাচ্ছে। আবার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির খবর আমানতকারীদের মধ্যেও আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে। অনেকেই ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে নেওয়ায় তারল্য চাপ বাড়ছে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ কমানো এবং ডলারের বিনিময় হার সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে স্থিতিশীল রাখতে হবে।
মাহ্বুব উল্লাহ্ বলেন, ব্যাংকগুলোর ১৭ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৬৩ দশমিক ৩১ শতাংশ ঋণের বিপরীতে স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক নেওয়া হয়। তবে ব্যাংকের হাতে থাকা সম্পত্তি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, প্রভাবশালী ও বড় ঋণখেলাপির সম্পত্তি কিনতে চাচ্ছে না। বর্তমানে দেশে একজন ক্রেতাও নেই, যিনি ঘোষিত ৫০০ কোটি বা এক হাজার কোটি টাকা দিয়ে সম্পত্তি কিনতে ইচ্ছুক আছেন। ভোগ্যপণ্য খাতের বড় একটি শিল্পগ্রুপ সম্প্রতি সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। তারা ৪০০ কোটি টাকায় কোম্পানিটি কেনার একজন ক্রেতা পেয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১০০ কোটি দেবে। বাকি ৩০০ কোটি টাকা নগদে পরিশোধ করতে চায়।
তিনি বলেন, গত দুই দশকে সম্পত্তির দর কিছু ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ গুণ বেড়েছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মৌজা রেট বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়নি। এতে রেজিস্ট্রেশন ফি কমাতে সবাই মৌজা দরে রেজিস্ট্রেশন করতে চায়। ফলে বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করে খেলাপি ঋণ উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় নির্দেশে এই ফারাক দূর করতে পারলে সমস্যার আংশিক সমাধান হবে। এ সমস্যা দূর করতে তাঁর প্রস্তাব– কালো টাকার মালিকদের খেলাপি ঋণ উদ্ধারে বিনিয়োগ করার সুবিধা দিয়ে সমস্যার একটি সমাধান খোঁজা যেতে পারে। তবে যারা কালো টাকা সাদা করবে, তাদের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট হারে সরকারকে এককালীন একটি কর দিতে হবে।
তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের দুর্বল করলেও সমূলে উৎপাটন করতে পারেনি। এসব ক্ষমতাধরের বিরুদ্ধে চলমান মামলা নিষ্পত্তি করতে পারলে তাদের ক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ করা সম্ভব হবে। গবেষণা সংস্থা সিপিডির সংকলিত তথ্যের বরাতে তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ২৪টি বড় জালিয়াতির ঘটনায় সব মিলিয়ে ৯২ হাজার ২৬০ টাকা লোপাট হয়েছে। হলমার্ক গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, অ্যাননটেক্স ও রিজেন্ট হসপিটালের মতো বড় বড় খেলোয়াড় জড়িত। এ ছাড়া এস আলম গ্রুপ এককভাবে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে দুই লাখ কোটি টাকা বের করে নিয়েছে। এই বিপুল অর্থ মূলত বৈদেশিক মুদ্রা ও ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
- বিষয় :
- ব্যাংকে প্রতারণা