ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

পেশিশক্তির মজা যারা পেয়ে গেছে ...

পেশিশক্তির মজা যারা পেয়ে গেছে ...
×

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৫৯

প্রতিদিনই খবরের কাগজ ভরে সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে, যেখানে নির্বাচনী প্রচারের সময় নানা ধরনের হামলার মুখোমুখি হচ্ছে প্রার্থী-সমর্থকরা। নির্বাচনে এই হামলার ইতিহাস অনেক দিনের পুরোনো। একবার আশির দশকে এক নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে বলে ফেললেন, ১০টা হুন্ডা ও ২০টা গুণ্ডা হলেই নির্বাচনে জয়ী হওয়া যায়। সেটা ছিল একটা স্বৈরাচারের সময়। মাঝেমধ্যে নির্বাচন হতো; কিন্তু নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হতো অন্য কোনো জায়গায়। এরপর দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হলো। এই ব্যবস্থায়ও হুন্ডা ও গুণ্ডাদের প্রভাব কমলো না। এক শ্রেণির তরুণ অভিহিত হলো ক্যাডার হিসেবে। এই ক্যাডাররা আবার সশস্ত্র। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে গিয়ে এরা ক্যাডারদের নিয়োগ করে, ক্যাডাররাও যথার্থ নিবেদিতপ্রাণ। নানা ধরনের সংঘর্ষে প্রাণ দিতেও তাদের দ্বিধা নেই। আবার নির্বাচনের সময় অর্থের লেনদেনটাও বাড়ে। ক্যাডাররা অপেক্ষাও করে কখন নির্বাচন হবে আর দেদার টাকাপয়সা নাড়াচাড়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে। দিন দিন নির্বাচনের ব্যয় বেড়েই চলেছে। অনেক অফিস এই সময় খুলতে হয়, দেদারসে চা-সিগারেট ছাড়াও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়।

নির্বাচনের আগের দিন তো রীতিমতো পোলাও-বিরিয়ানির ধুম পড়ে যায়। এখানে ক্রমাগতভাবে উপযুক্ত প্রার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে, অর্থ ও ক্যাডারই একমাত্র নিয়ামক শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এসব জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও নিরপেক্ষ থাকে না, আনুগত্য থাকে সরকারি প্রার্থীদের প্রতি। তবুও পরাজয় নিশ্চিত ভেবেই কিছু বিরোধী প্রার্থী নির্বাচনে নামেন। অতীতে এখনকার বিরোধী প্রার্থীরা যখন সরকারি দলে ছিলেন, তারাও একই ভূমিকা পালন করেছেন। এ শুধু স্থানীয় সরকার বা জাতীয় নির্বাচনের চিত্র নয়, দেশে হাজার হাজার নির্বাচন হয়, সেটি কখনও শ্রমিকদের নির্বাচন, কখনও স্কুলে, কখনও সাংস্কৃতিক সংগঠনে, ক্লাবের নির্বাচনসহ অনেক নির্বাচনে একই চিত্র। ঢাকা শহর ও সারাদেশে যে ক্লাবগুলো আছে, সেই ক্লাবগুলোতেও মারামারি, হাতাহাতি তো থাকছেই; সেই সঙ্গে থাকছে বিপুল পরিমাণ অর্থের আয়োজন। হয়তো-বা ওইসব নির্বাচনে যারা জয়ী হবেন, তাদের অর্থ উপার্জনের কোনো পথ নেই; কিন্তু কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচিত হওয়া খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। একদা নিম্নবিত্তের মেধাসম্পন্ন, জনপ্রিয় নেতৃত্ব সব জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন এবং জনসমর্থনে তারা বিজয়ী হতেন। টাঙ্গাইলের করোটিয়ার জমিদার খুররম খান পন্নী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রায় কপর্দকহীন শামসুল হকের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এমনি অসংখ্য উদাহরণ আমাদের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের রাজনীতিতে আছে। আর তা আছে বলেই একাত্তর সালে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিল। যদি এই ধারা এখনও বহাল থাকত, তাহলে দেশটা অনেক বেশি মানবিক হতে পারত, সমৃদ্ধি আসত মূল্যবোধকে নিয়ে। এখন সমৃদ্ধি আসছে, শত-হাজার কোটি টাকার মালিক হচ্ছে কিছু নিম্নবিত্ত মানুষই। কিন্তু সেই টাকা আসছে পাপের পথে, অবৈধ ও অন্যায়ভাবে।

একসময় দেখেছি স্কুল শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। তিনি নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন মানুষের কথা ভেবেছেন; কিন্তু আজকের বিত্তবান যারা জনপ্রতিনিধি হবেন, তারাও ভুল পথে সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের কথা ভাবছেন। পেশিশক্তি ও কালো টাকা এই উন্নয়নকেই দেখায়। একদা ঊনবিংশ শতাব্দীতে জাপানের সোগান আধিপত্য ছিল। সোগানরা পেশিশক্তিকেই মূল শক্তি বলে মনে করত। সোগানদের নিষ্ঠুরতা শুধু তাদের দেশে নয়, বিদেশেও সুবিদিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে জাপানে মেইজি সংস্কার শুরু হলো। তারা মনে করলেন- পেশিশক্তি নয়, শিক্ষা, মূল্যবোধ, মেধা- এসবই হবে মানুষের ভাগ্যের নিয়ন্তা। শুরু হলো শিক্ষা আন্দোলন। ২৫-৩০ বছরের মধ্যে তারা প্রায় একশ'ভাগ মানুষকে শিক্ষিত করে তুললেন। এটা ছিল তাদের প্রথম বিজয়। যদিও বিংশ শতাব্দীর মাঝখানে এসে সুপ্ত সোগান সংস্কৃতি এসে ভর করল শাসকদের মধ্যে। যে কারণে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ফ্যাসিস্ট শক্তির সঙ্গে তারা জড়িয়ে পড়লেন। পরিণাম হলো ভয়ংকর। সেই ভয়ংকর পরিণাম থেকে মেইজি সংস্কার আবার দ্রুত উঠে দাঁড়াল। যে কারণে মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে জাপান একটা শিল্প বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলল। শুধু তাই নয়, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তারা হয়ে গেল পৃথিবীর অগ্রগণ্য জাতি। শিক্ষাতেও তারা দ্রুত উন্নতি লাভ করল। আজকের দিনে বাংলাদেশ কি এসব উদাহরণ থেকে পেশিশক্তির পরিণাম দেখতে পাবে না? খুবই মর্মাহত হই যখন দেখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ডাকসু ভিপি বারবার মার খায়। প্রতিপক্ষকে দমানোর জন্য অস্ত্রের মহড়া দেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সর্বোচ্চ পীঠস্থান। সেখানে উপাচার্য আছেন, বিভিন্ন হলের প্রভোস্ট আছেন, প্রক্টর আছেন এবং তদুপরি আছেন সবচেয়ে শিক্ষিত শিক্ষকবৃন্দ। তাঁদের দলবদ্ধতার কারণে তাঁরা সঠিক ভূমিকাটিও পালন করতে পারছেন না। কেউ উচ্চকণ্ঠে বলতে পারছেন না, এসব ঘোরতর অন্যায়; এই অন্যায়কে রোখা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সরকার কর্তৃক নিয়োগ পেয়ে থাকেন। আর এই নিয়োগ সর্বত্রই প্রশ্নবিদ্ধ! নিরপেক্ষ ও শিক্ষানুরাগী ছাত্র-শিক্ষকরা অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন। তাঁরা সবকিছুই বোঝেন; কিন্তু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে কিছু বলেন না। কারণ তাঁদের বেঁচে থাকা দরকার।

সমস্যা যদি এই দাঁড়ায় যে, নাগরিকরা নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য কথা বলতে পারছেন না, তাহলে তো মুশকিলের কথা। ভারতে দীর্ঘদিন গণতন্ত্র চর্চার ফলে বেশ কিছু জনগণের কণ্ঠস্বর তৈরি হয়েছে; যারা নির্দি্বধায় সত্য কথাটি বলে যাচ্ছেন। আমেরিকার মতো দেশে নোয়াম চমস্কি তার কথাগুলো বলতে পারছেন; হয়তো সত্য বলার কারণে তিনি রাজ অনুগ্রহ পাচ্ছেন না। কিন্তু পরের দিনই কেউ তার মাথা ফাটিয়ে দিচ্ছে না অথবা তার বাসগৃহে চড়াও হচ্ছে না। পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় বিপ্লব হচ্ছে, সত্য কথা বলা। সত্যের মতো একটা ভয়ংকর কথা যেমন নেই, তেমনি যে কোনো সত্য ভাষণ রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের জন্য অনেক নিরাপদ। মহামান্য রাষ্ট্রপতি গল্পের ছলে অনেক সত্য কথা বলে থাকেন। যদিও সমাবর্তন বক্তৃতায় এগুলো অনেকের কাছেই অশোভন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু তিনি বলে থাকেন, যার মধ্যে অনেক সমালোচনা থাকে। সেই সমালোচনাগুলো যথার্থই কি সেই মানুষগুলোকে স্পর্শ করে? যাদের বিরুদ্ধে তিনি বলেন। চার্লি চ্যাপলিন একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন তা হলো, আমরা অনেক কথা বলি; কিন্তু তার মধ্যে কতটুকু অনুভব করি? মুখের কথা বলা এবং ইন্দ্রিয় দিয়ে তা অনুভব করা খুবই কঠিন কাজ।

ফিরে আসি নির্বাচন প্রক্রিয়ায়। প্রার্থীরা অনেক মুখের কথা বলেন; কিন্তু তিনি ভাবেন না তার সীমাবদ্ধতার কথা। একধরনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয় দাঁড়িয়ে গেছে এবং প্রার্থীরা জানেন, এগুলোকে পরে বাস্তবায়ন না করলেও হয়। ক্ষমতায় আসার পর কেউ এসে মাথায় বাড়িও দেবে না। তাই বলে যাই। কারণ তারা জানে, এক ধরনের উন্নয়ন হবেই। পৃথিবীর পরাশক্তিরা গ্লোবাল ভিলেজ এবং মার্কেট ইকোনমির কারণে কোনো দেশ দরিদ্র থাকুক, এটা তারা চায় না। বরং তারা চায় বাজার সম্প্রসারণ। বাংলাদেশে সেটা হয়েছেও। বাংলাদেশ এখন একটা বড় দোকান। যেখানে একটু জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই একটি দোকান বসে যায়। দোকান মানে টাকা। একদা বঙ্গীয় সংস্কৃতিতে হাটবাজার ছিল। সেটাও ছিল সীমিত আকারে। সপ্তাহে একদিন ছিল হাট। যেখানে সর্বস্তরের মানুষের চাহিদা মেটানো হতো। আর ছিল প্রাতঃকালীন বাজার। এখন বড় বড় শহরে বিশাল বিশাল দোকানের সমারোহ; সেই সঙ্গে গ্রামীণ জীবনেও সর্বত্র বাজার। একটা উপজেলা শহরেও অনেক সুপার মার্কেটের উপস্থিতি। পাশে আবার কোচিংয়ের সুপার মার্কেট। শিক্ষা ও পণ্য মিশে একাকার হয়ে গেছে। তার মানে ওই কোচিং সেন্টারগুলোও এক একটা সুপার মার্কেট। শিক্ষকরা বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করে থাকেন ওই সুপার মার্কেট থেকে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, পেশিশক্তির মজা যারা পেয়ে গেছে, তারা উচ্চশিক্ষা নিলেও কোনো চাকরি-বাকরি বা শোভন কোনো পেশায় আসতে আগ্রহী নন। তারা তাদের পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে কোনো নেতার ক্যাডার হিসেবে থাকতে আগ্রহী। কারণ টাকাপয়সার একটা বড় দান মারতে পারলেই কাজ হয়ে যায়। হওয়া যায় দ্রুত কোটিপতি। এই দ্রুত কোটিপতিরা ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িয়ে যায়; নির্বিঘ্নে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়ে একসময় জেলহাজতে গেলেই-বা অসুবিধা কী। এখন সময় এসেছে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করা। না হলে সত্যিকার অর্থে আমরা একটি বিপদগ্রস্ত জাতি হয়ে পড়ব। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কালে এই সমস্যাটি একটা গভীরতর সংকটের জায়গায় গিয়ে পৌঁছাবে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

আরও পড়ুন

×