ধর্ষণ বিচার আচার
মঈদুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:১১
ধর্ষকদের ক্রসফায়ারের দাবি উঠেছে। সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে চাইলে
'এনকাউন্টার' নিশ্চিত করতে হবে, চিহ্নিত ধর্ষককে জিজ্ঞাসাবাদের নামে
বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারতে হবে। এটাই নাকি ধর্ষকদের
জন্য বর্তমানের ধন্বন্তরী দাওয়াই! ধর্ষকদের 'ক্রসফায়ার' করলে বেহেশতে
যাওয়াও নিশ্চিত বলে আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে তরিকাও দেওয়া হয়েছে। (সমকাল,
১৫ জানুয়ারি ২০২০) এক দাওয়াইতেই দুই প্রাপ্তি! ধন্বন্তরী বটে! এটা সত্যি
যে, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদেরও ইহকালে এমন কিছু দৃশ্যমান নগদ বিচারের কার্যকর
ব্যবস্থা তারা করবেন- এই আশায় জনগণ তাদের বেহেশতপ্রাপ্তির জন্য মন খুলে
দোয়া করতে দু'হাত তুলে বসে আছে।
মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থাই বটে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিবেদন মতে,
২০১৯ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৫০০ জন। রাস্তাঘাটে তো বটেই, কিছু পত্রিকা,
টেলিভিশন চ্যানেলে পর্যন্ত 'গোপন রোগ'-এর ওষুধের প্রকাশ্য প্রচার চলছে
রাতদিন। সেসব তবে বিকায় কার কাছে! নাকি ধর্ষক বৃদ্ধি পাওয়া এসব ওষুধেরই
বিকার! বন-বাদাড়, পাহাড়, বাঁশঝাড়, ধানক্ষেত, পাটক্ষেত বিলীন করে গজিয়ে উঠছে
হাউজিং, শপিং মল, মার্কেট। সর্বত্র মানুষ, মার্কেট আর যানবাহনে গিজগিজ।
ধ্যানে বসার নিভৃত জায়গা নেই, সেখানে ধর্ষণের অনুকূল নির্জনতার পরিবেশ
হচ্ছে কী করে! তাহলে কি আমরা এত লোকের মাঝে প্রত্যেকেই হচ্ছি আলাদা! হাজার
লোকের ভিড়ে আমাদের চোখ, বিবেক পড়ছে ঢাকা! বিশাল জনারণ্যে সৃষ্টি হচ্ছে গভীর
শূন্যতা! বিজ্ঞান, প্রযুক্তির চাকায় ঘুরতে ঘুরতে মনুষ্যত্বের মুখ অলখিতে
ঘুরে গেছে উল্টো দিকেই! বেহুঁশ এখন ছুটছি পেছনের দিকেই।
এর মধ্যে আবার জনস্বার্থে এক রিটের আরজি পড়েছে মাননীয় হাইকোর্টে। চাইছেন
চরম সাজা শুধু শিশুধর্ষণে। ধর্ষণের আর সব অপরাধের ওজন কমছে কি বয়সে!
চিহ্নিত ধর্ষককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে গিয়ে পুলিশের গুলি করা যদি হয়েই
যায়, তাহলে তো আইন ব্যবসার ৯০ শতাংশ উঠেই যাবে! অপরাধী সুচিহ্নিত। সাজা
ঘোষণা শুধু নয়, নগদ প্রদানও শেষ। সাজা কার্যকর শেষ করে যদি রেজিস্ট্রির
দরকার হয়, তবে দায়রা আদালত থাকতে পারে, রেজিস্ট্রিজট এড়াতে বেশ কিছু! তবে
সেখানে আইনজীবীর তো কাজ থাকে না! সাক্ষীই নেই তো জেরা-জবানবন্দি কীসের!
যুক্তিতর্কের তর্কাতর্কি নেই, আপিল রিভিশনের দফারফা। আইনজীবী থাকলে থাকবেন
হয়তো দেওয়ানির সালিশে, আর হাইকোর্টে অল্পস্বল্প রিটে। ফৌজদারি তো হচ্ছে
মোবাইল কোর্টে। বাকি যেটুকু তাও যাবে ক্রসফায়ারে। মামলাজট বাধার বা বাধানোর
ওজর-অজুহাত সত্যি হবে খোঁড়া। এমনটা স্বপ্নে দেখেও শান্তি!
কিন্তু দেখামাত্রই কি ধর্ষক চেনা যাবে? এ তো আর অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে বহু
কষ্টে প্রাণে বাঁচা বেশি পানি আত্মসাতের চিহ্নিত অপরাধী উট নয়, যে
হেলিকপ্টারে উড়েও ঠিক চেনা যাবে আর গুলি করা যাবে। উটমাত্রেই এই অপরাধী
হয়তো বৈজ্ঞানিক সত্য, তাই প্রমাণ অনাপেক্ষ। কিন্তু পুরুষমাত্রেই কিংবা
বিশেষ কোনো মার্কামারা চেহারার পুরুষমাত্রেই ধর্ষক- এমন কোনো বৈজ্ঞানিক
তত্ত্ব তো আসেনি। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে আসলেই এ দুস্কর্ম করেছে কিনা,
তার বাছ না করে তো বিচার হয় না। বিচারে এটাই গুরুত্বপূর্ণ- সত্য-মিথ্যার
বাছবিচার। লোক দেখানো ব্যাপারটা সবসময় ভালো না হলেও বিচার কিন্তু হতে হবে
সব লোককে দেখিয়েই। চোখে না দেখলে বিচার বিশ্বাস করতে চায় না লোকে। সে জন্যই
লাগে কিছু আচার-অনুষ্ঠান; সাক্ষী-প্রমাণ হাজির করা। সেগুলো মিথ্যা কিনা,
তা বলার সুযোগ আসামিকে দেওয়া। লাগবে তদন্ত, লাগবে আইনজীবী, বিচারক। 'আমিই
হবো উকিল-হাকিম, আমিই জুরি'- এর মতো নয়। প্রত্যেকটি আলাদা। এত সবের
সম্মিলিত আচার হলে হবে সভ্য সমাজের প্রকাশ্য ন্যায়বিচার এবং সেটা হতে হবে
আদালতে আর ট্রাইব্যুনালে, যার কথা আমাদের সংবিধানে লিখিত (অনুচ্ছেদ ৩৫, দফা
৩)। তা না হলে 'জজ মিয়া', 'জাহালম' আর 'মিন্টু'- এরা বাঁচার শেষ
সুযোগটুকুও হারাবে। বিচার না দেখিয়ে শুধু সাজা দেখানো হবে অনাচার। বোঝা
যাবে 'আশীবিষে দংশিলে' নিজেরে। এখন যদি মুখ সত্যিই পেছন দিকে ঘুরে গিয়ে
থাকে, তাহলে আর 'কাহারে করিব রোষ'।
কিন্তু
বিচারে আমাদের বাছার অবস্থাটা এমনই দাঁড়িয়েছে যে, শেষে বিচারই আর থাকে
কিনা। সাক্ষী আর প্রমাণের প্রতিবেদন দিয়েই বাদীর দায় শেষ। হাজির আর করে না।
সেগুলোকে আসামি কেবল 'হুজুর, সত্য নয়' বলেই খালাস। অবস্থা এমনই যে, সত্য
প্রমাণে তাগিদ তো নেইই। মিথ্যা যে- সেটাও প্রমাণে কারও গরজ নেই।
সত্য-মিথ্যার ধন্দেই হচ্ছে খালাস। সন্দেহে সাজা সভ্য বিচারে হয় না। প্রকৃত
অপরাধীর কাছেও বিচারের সাজা থাকছে 'দূরের বাদ্য' হয়েই। ইহকালে তো ভাবনা
নেই, পরকাল দেখা যাবে পরে।
বছরে কত ধরনের অপরাধ কত সংখ্যায় হয়, তার পরিসংখ্যান আমাদের হচ্ছে। কিন্তু
বছরে কতটার তদন্ত হয়, তদন্তকারী কতজন, একেকজনের কাছে কতটা তদন্ত, কত বছর
ঝুলে, বিচারক কতজন, একেকজনের কাছে কতগুলো মামলা, নিষ্পত্তি কত, সেসবের
পরিসংখ্যান তেমন গুরুত্ব পায় না। অপরাধের ঘটনা বাড়ছে, মামলা বাড়ছে (যার
মধ্যে ডাহা মিথ্যা, আধা মিথ্যার ভাগও কম নয়)। বাড়ছে আইনজীবীর সংখ্যাও;
কিন্তু তদন্তকারী আর বিচারক বাড়ছে কি সে হারে? বাড়ছে কি বিচারালয় আর সহায়ক
কর্মচারী? বিচারকদের হূষ্টচিত্তে কাজ করার মতো সুযোগ-সুবিধা, মান-মর্যাদার
দিকে কি নজর আছে কারও! তদন্তে আর বিচারে তথ্যপ্রযুক্তি যুক্ত করার গতি কত
জি নেটওয়ার্কের, কত এমবিপিএস! মিথ্যা সাক্ষ্যের ফাড়া কাটিয়ে সত্য সাক্ষ্য
দেওয়ার নিরাপদ অবস্থা এবং আদালতে স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশ কি আছে, যে
সাক্ষীরা সব ছুটে আসবে!
অপরাধের ভয়ংকর গতি আর বিচারের দুর্গতিতে মাননীয় সংসদ সদস্যরা তো উদ্বেগে
আকুল হবেনই। আবেগ তো বাঁধ ভাঙবেই। আমাদের আইন কমিশন ১৯৯৬ সাল থেকে কাজ
করছে। যার অন্যতম দায়িত্ব দেওয়ানি, ফৌজদারি মামলার বিচার নিষ্পত্তির
বিলম্বের কারণ চিহ্নিত করে তা দূর করার উপায় সুপারিশ করে প্রতি বছর সরকারের
কাছে প্রতিবেদন দেওয়া, যা সংসদে উপস্থাপিত হওয়ার কথা। দুদকেরও এ রকম
বার্ষিক প্রতিবেদন মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে যায় এবং তাও সংসদে উপস্থাপিত
হওয়ার কথা। দুদক বা আইন কমিশনের বার্ষিক রিপোর্ট নিয়ে সংসদে জোর আলোচনার
কথা শোনা যায় না। মহান সংসদে এসব কমিশনের রিপোর্টগুলোর আলোচনা হলে সঠিক
আইনের সুস্থ সুন্দর আধুনিক একটা বিচার ব্যবস্থা জাতি পেতে পারে। আবার
কমিশনগুলোর জবাবদিহিও হয় কিছুটা।
কিছু আচার ছাড়া বিচার ভাবা যাবে না। তবে অস্বীকারের উপায় নেই যে, আচারের
নামে নানা ফন্দি-ফিকিরে অনাচার ও অতি আচার (ব্যাকরণের সন্ধিতে হয় অত্যাচার)
কিছু কম হচ্ছে না। এখন শুনছি, আইনজীবীরা মক্কেলের থেকে আয়টুকু নেবেন,
কিন্তু তাদের ফন্দি-ফিকিরের কোনো দায় নেবেন না বলে বার কাউন্সিল আইনে 'সরল
বিশ্বাস'-এর বিধান চাইছেন। তদন্তকারী আছেনই সরল বিশ্বাসে; বিচারক তো
বিচারের ঊর্ধ্বে। যত দায় হলো শুধু সত্যিকারের ফরিয়াদির আর নিরপরাধ আসামির!
এই হলে তো বিচার থাকবে দূর আকাশেই!
দায় নিতে হবে প্রত্যেককে, যার যতখানি। আপিল, রিভিশন, কোয়াশমেন্ট আর রিট করে
বিচার আটকে রাখার অবাধ ফন্দি-ফিকিরে জরিমানা, সাজার কিছু একটা বাঁধ দিতে
হবে। সাক্ষীদের সাক্ষ্য দেওয়ার আগে-পরের নিরাপত্তা (কাগুজে নয়, সত্যিকারের
ভরসা) আর আদালতে তাদের স্বচ্ছন্দ পরিবেশ দিতে হবে, যেমনটা আছে উন্নত
দেশগুলোতে। মিথ্যা মামলা, মিথ্যা সাক্ষ্য, আদালতে জালিয়াতির সাজা দিতে হবে
প্রত্যেকটিতে। তদন্ত আর বিচারে তথ্যপ্রযুক্তিসহ আধুনিক সব প্রযুক্তি লাগাতে
হবে এখনই। অনাচার, অতি আচার আর গাফিলতির দায় নির্ধারণ করতে হবে
প্রত্যেকের। তদন্তকারী, আইনজীবী, বিচারক, দায়বদ্ধতা থাকতে হবে সবার।
জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না কাউকে। না হলে অনাচার আর ক্রসফায়ারে হারিয়ে
যাবে বিচার। থাকবে কেবল সর্বজনের হাহাকার।
সাবেক সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল)
[email protected]
- বিষয় :
- সমাজ
- মঈদুল ইসলাম
