ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

এক দার্শনিক সম্পাদক

এক দার্শনিক সম্পাদক
×

রেহানা সালাম

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১২:৩৩ | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১০:৩৯

আব্দুস সালাম, বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের অন্যতম নক্ষত্র। ছোটখাটো এ মানুষটিও তাঁর মেধা, চিন্তা দিয়ে; সাহস দিয়ে, লেখা দিয়ে আকাশ ছুঁয়েছিলেন। কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন শাসকের দম্ভ আর জনগণকে কীটপতঙ্গ মনে করার দুঃসাহসকে।

মাতৃভাষা না হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজিতে তিনি লিখেছেন এবং জয় করে নিয়েছেন জনহৃদয়। ৫০০ থেকে ৫০০০ কপিতে পৌঁছে গিয়েছিল তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা অবজারভার। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তিনি ছিলেন লেখার জাদুকর। এমন কোনো বিষয় ছিল না, যা তিনি জানতেন না বা বুঝতেন না। অর্থনীতি, বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সাহিত্য- প্রতিটি বিষয়ে তিনি জানতেন। শুধু বই পড়াই নয়; বিষয়গুলোকে গভীরভাবে আত্মস্থ করতেন।

অসাম্প্রদায়িক ছিলেন আব্দুস সালাম। ধর্মের প্রচলিত আচার-আচরণে অভ্যস্ত ছিলেন না। আমার মনে আছে, গভীর রাতে আমি ঘুম ভেঙে দেখেছি তিনি নামাজ পড়ছেন। সাংবাদিক খন্দকার আব্দুল হামিদ ও আব্দুস সালাম একসঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে লন্ডন গিয়েছিলেন। খন্দকার আব্দুল হামিদ বলেছেন, হোটেলে মাঝেমধ্যে আব্দুস সালাম ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়তেন। তখন তিনি বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন; জেগে আছেন, না ঘুমিয়ে আছেন- কিছুই বোঝা যেত না।

সাংবাদিক হিসেবে যিনি ছিলেন ইস্পাতের মতো কঠিন, আপসহীন পিতা হিসেবে তিনিই ছিলেন অসাধারণ কোমল, স্নেহময়। তিনি কখনও তাঁর কোনো সন্তানকে শাসন করেছেন বলে আমার জানা নেই। কোনো অপরাধ করলেও মায়ের হাত থেকে তিনিই আমাদের রক্ষা করতেন। মাকে লুকিয়ে দরিদ্র কাউকে টাকা দিতে গিয়ে লুকোচুরির ঘটনা বহুবার ঘটেছে। প্রায়ই দুই পায়ে দু'রকম জুতো পরে অফিসে যেতেন। অথচ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভেতর অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থাতেই ১৯৪৯ সাল থেকে অবজারভাবে লিখতে শুরু করেন ইকোনমিক নোটস।

১৯৫০ সালে সরকারি চাকরির সচ্ছলতা, ক্ষমতা সব মোহ ছেড়ে আব্দুস সালাম বেঁচে ছিলেন সে সময়ের অর্থনৈতিক ঝুঁকি, রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ পেশা সাংবাদিকতা নিয়ে। অবজারভার আব্দুস সালামের সাহস আর মেধার ওপর ভর করে হামিদুল হকের নীরব সমর্থনে রাতারাতি সরকারবিরোধী পত্রিকায় পরিণত হলো। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অবজারভার পত্রিকাকে তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করা শুরু করল। পাশাপাশি এ পত্রিকাটি উদার ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবকে নীতিমালা হিসেবে গ্রহণ করে। পত্রিকাটি হয়ে উঠেছিল শিক্ষিত, সচেতন, দেশপ্রেমিক পূর্ববঙ্গের মানুষের হৃদয়ের দর্পণ। বিষয়টি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে অবজারভাবের একটি সম্পাদকীয়কে ইসলামের অবমাননার অজুহাত তুলে ১৯৫১ সালে অবজারভার বন্ধ করে দেওয়া হয়। মৌলভীরা পথে নামে আব্দুস সালামের কল্লা চাই স্লোগান দিয়ে।

১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভাষা আন্দোলনকালে আব্দুস সালামই ছিলেন প্রথম পত্রিকা সম্পাদক। ১৯৫৪ সালে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার প্রয়োজনে তৈরি হলো যুক্তফ্রন্ট। প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের অনুরোধে আব্দুস সালাম নৌকা মার্কা নিয়ে ফেনী থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ততদিনে আব্দুস সালামও বুঝে গেছেন, মাঠের রাজনীতি তার জন্য নয়; কলমের যুদ্ধেই তিনি অভ্যস্ত। তাই তিনি সাংবাদিকতাকেই গভীর ভালোবাসায় আঁকড়ে ধরলেন। তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খান অবজারভার ও আব্দুস সালামকে অপছন্দ করতেন যদিও; কিন্তু তিনি জানতেন, এ পত্রিকাটি যা লেখে ও আব্দুস সালাম যা বলে তা পূর্ববঙ্গের জনগণের মনের কথা এবং তা সম্পূর্ণ সত্য। শোনা যায়, আইয়ুব খান প্রতিদিন অবজারভার পড়তেন এবং পত্রিকায় প্রকাশিত খবর ও সম্পাদকীয় সম্পর্কে বিশেষভাবে হদিস রাখতেন।

আব্দুস সালামের মেধা, নেতৃত্বের ক্ষমতা ও ব্যবহার তাঁকে সারা পাকিস্তানের সম্পাদক মহলে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। যে কারণে তিনি একসময় পাকিস্তান সম্পাদক পরিষদের সভাপতি মনোনীত হন। পূর্ববঙ্গের সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আব্দুস সালাম, জহুর হোসেন চৌধুরী, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সবসময় সক্রিয় ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তারা ছিলেন এক মন, এক প্রাণ; যদিও কখনও কখনও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যেত। কোনো বিভাজন নয়, আত্মসমর্পণ নয়, লেজুড়বৃত্তি নয়। দেশের স্বার্থ, পেশার প্রতি বিশ্বস্ততা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দেশকে মানুষকে প্রকৃতিকে অসম্ভব ভালোবাসতেন আব্দুস সালাম। তার এক বন্ধু আমাকে একটা এয়ারগান উপহার দিয়েছিলেন। আমি ধানমন্ডি লেকে এয়ারগান দিয়ে পাখি মারতে চেয়েছিলাম বলে তিনি এয়ারগানটাই ভেঙে ফেলেছিলেন। আমি তাকে কখনও দেখিনি কাউকে আঘাত করতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার, বারবার নানা অকারণে তাকেই ভিন্ন ভিন্ন লোকের কাছ থেকে আঘাত পেতে হয়েছে। সম্ভবত তিনিও জানতেন না, কেন তাকে বারবার প্রতিহিংসার শিকার হতে হয়। তার পরিবারও জানে না, আর কতদিন তাকে মনে রাখার দায়িত্বটা শুধু তার সন্তানকেই নিতে হবে।

আমাদের আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকরা কি জানবে- তাদের জন্য এ মহাসড়কটি তৈরি করার জন্য আব্দুস সালাম, জহুর হোসেন চৌধুরী, মানিক মিয়া, মওলানা আকরম খাঁ, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, এবিএম মূসা এবং আরও অনেকে কতখানি সময় ব্যয় আর কষ্ট স্বীকার করেছেন! আমরা কি তাদের মনে রাখার জন্য সত্যিই কিছু করব?

আবদুস সালামের কনিষ্ঠ কন্যা, সভাপতি সাংবাদিক আবদুস সালাম স্মৃতি সংসদ

আরও পড়ুন

×