স্বল্পোন্নত দেশের ক্রিকেট নিয়ে অল্প অল্প গল্প
শেখ রোকন
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১২:৩৭ | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১০:৩৮
দক্ষিণ আফ্রিকায় সদ্য সমাপ্ত অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিজয় কেবল ক্রীড়া নৈপুণ্য নয়, আরও নানা বিষয়ে বিস্ময়ের জন্ম দিয়ে চলেছে। সপ্তাহখানেক আগেও সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় অপরিচিত ওই টিনএজাররা এখন বহুল পরিচিত। তাদের বোলিং, ব্যাটিং, ঠান্ডা মাথায় প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করা- এগুলো নিয়ে আলোচনা তো হচ্ছেই। কনিষ্ঠ বা উদীয়মান এসব ক্রিকেটারের কাছ থেকে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দেরও যে শিক্ষণীয় রয়েছে, তা খোদ মাশরাফি বিন মুর্তজা স্বীকার করে নিয়েছেন। ফলে এ নিয়ে অবাক হওয়ার সুযোগ সামান্য। বিস্ময়ের মূল কারণ তাদের পারিবারিক প্রেক্ষাপট। একেবারে খেটে খাওয়া পরিবার থেকে, বামপন্থিদের ভাষায় 'প্রলেতারিয়েত' শ্রেণি থেকে এসে, বহুমাত্রিক অভাবের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠে তারা দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। শুধু প্রতিনিধিত্ব নয়, জনসাধারণের হৃদয় জয় করছেন। রোববার শিরোপা বিজয়ের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা বুধবার তাদের দেশে ফেরার সময় গণপ্রতিক্রিয়া দেখে এর খানিকটা আঁচ করা যায়।
ক্রিকেট মানে যে নিছক বাইশ গজের ব্যাটিং-বোলিং নয়, তা বোঝাতে গিয়ে ক্রীড়া সাংবাদিকদের এখন আর গলদঘর্ম হতে হয় না। অথচ কয়েক বছর আগেও আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলে এই খেলার বাণিজ্য, এমনকি 'সাম্রাজ্যবাদী' চরিত্র নিয়ে বিতর্ক বিরল ছিল না। এখনও যে সে ধারা নেই, তা বলা যাবে না। কিন্তু ক্রিকেটবিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান যত সংহত হয়েছে, খেলাটি নিয়ে সমালোচনার ধার তত কমে গিয়েছে। নেপথ্য কারণ যাই থাকুক, দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ-অনুভূতি যে খেলার সঙ্গে জড়িত, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের জনপরিসরে তার সমালোচনা করতে আগপিছু ভাবতে হয় বৈকি। অনেকে পছন্দ করতে নাও পারেন, কিন্তু জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বিনির্মাণেও ক্রিকেটের ভূমিকা এখন স্বীকৃত। কয়েক বছর আগেও ক্রিকেটে ভারত-পাকিস্তান দলকে সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশি সমর্থকদের বিভক্তি এখন বহুলাংশে কমে এসেছে। নিজের দেশের দল আছে না?
বেশিদূর যেতে হবে না, প্রতিবেশী ভারত নিয়ে একটি প্রচারণা প্রায় প্রবাদে পরিণত হয়েছে- বহু ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির ভারতকে সংহত রেখেছে বলিউড ও ক্রিকেট টিম। বলিউডের রুপালি পর্দায় যেসব গল্প ও চরিত্র উঠে আসে, দেশের একটি বড় অংশ সেখানে নিজের প্রতিফলন দেখতে পায়। 'আফসানা' বা প্রেমের গল্প যে বাস্তবতা তৈরি করে, সেখানে তরুণ-তরুণীরা নিজেদের স্বপ্নের জগৎ মূর্ত হয়ে উঠতে দেখেন। আর ভারতীয় ক্রিকেট প্রমাণ করেছে, প্রতিভা ও যোগ্যতা থাকলে যে কেউই টিম ইন্ডিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। প্রত্যন্ত ও পিছিয়ে পড়া ঝাড়খন্ড থেকেও মহেন্দ্র সিং ধোনি জাত্যাভিমানি পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশ সহযোগে গঠিত জাতীয় দলের অধিনায়ক হতে পারেন। ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদী ধারাগুলো গতি হারিয়ে ফেলার পেছনে বলিউড ও ক্রিকেটের 'উন্মাদনা' কতটা ভূমিকা রেখেছে, সীমান্তের ওপাশে অনেক সমাজবিজ্ঞানীই তা নিয়ে কাজ করেছেন।
বাংলাদেশের ঢালিউড কেন বলিউড হতে পারেনি, সেটা ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু এখানেও ক্রিকেট ক্রমেই হয়ে উঠছে জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষার মাধ্যম। এখানেও এখন প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কিশোর জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। নিজের এলাকাতেও বহুলাংশে অচেনা তরুণটি ক্রিকেটের ব্যাট বা বল হাতে হঠাৎই হয়ে উঠতে পারে জাতীয় তারকা। আগে যেমন দরিদ্র পরিবারের সন্তানের বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করার একটিই উপায় ছিল, ভালোভাবে পড়াশোনা করে বড় চাকরি করা। এখন ক্রিকেট খেলেও পরিবারকে সমান সন্মান দেওয়া সম্ভব। এখন মেধা মানে যে নিছক বই-খাতার বিষয় নয়, বরং বল-ব্যাটেরও কারুকার্য- 'লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে' প্রবচনে অভ্যস্ত জাতিকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে আমাদের ক্রিকেট।
দরিদ্র পরিবার থেকে ক্রিকেট তারকা বনে যাওয়ার খবর আমরা অনেক দিন বিদেশ থেকে ধার করেছি। অস্ট্রেলিয়ান হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান ডেভিড ওয়ার্নার যখন উদীয়মান তারকা, তখনও থাকা-খাওয়ার খরচ জোগানোর জন্য প্যাকেজিংয়ের কাজ করতেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ডেল স্টেইন যেদিন প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে যাবেন, সেদিনও তার কাছে নতুন জুতা কেনার অর্থ ছিল না। বিপিএলের কল্যাণে বাংলাদেশে ব্যাপক পরিচিত ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিস গেইল কৈশোরে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে নিয়মিত পানির বোতল চুরি করে বাইরে বিক্রি করে দিতেন শুধু খাবার টাকা জোগাড়ের জন্য। অন্য কোনো কায়িক শ্রমে যোগ দিতে চাননি, কারণ ক্রিকেট খেলার সময় বের করতে হবে। ভারতের রবীন্দ্র জাদেজার বাবা কাজ করতেন নৈশপ্রহরী হিসেবে। পুরো পরিবার থাকত এক কক্ষের বাসায়। এই সেদিন ক্রিকেটের জন্মভূমি ইংল্যান্ডকে 'প্রথম' বিশ্বকাপ জিতিয়ে দেওয়া বেন স্টোকসের পরিবার কী ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসেছে, তা কয়েক দিন আগে প্রকাশ পেয়েছে। বেন স্টোকসের শিশু বয়সী সৎভাই-বোনকে গুলি করে হত্যা করে নিজেও আত্মঘাতী হয়েছিলেন মায়ের সাবেক সঙ্গী।
এই অল্প অল্প গল্পগুলো এখন আমাদেরও। দক্ষিণ আফ্রিকায় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের জয়সূচক শেষ রানটি নেওয়া ক্রিকেটার রাকিবুল হাসানের পরিবার উঠে এসেছে ময়মনসিংহের ফুলপুরে বিদ্যুৎহীন একটি গ্রাম থেকে। তিনি যখন ফ্লাডলাইটের আলোয় দেশকে জিতিয়ে দিচ্ছেন, সেই দৃশ্য তার স্বজনদের দেখতে হয়েছে পাশের গ্রামের চায়ের দোকানের টেলিভিশনে।
পেস বোলার শরিফুল ইসলামের ভ্যানচালক বাবা একপর্যায়ে পঞ্চগড়ের পাট চুকিয়ে ঢাকার সাভারে এসেছিলেন রিকশা চালাতে। একমাত্র বড় ভাই পোশাক কারখানার শ্রমিক। মা কী করতেন, সহজেই অনুমেয়। তবু শরিফুল ক্রিকেট ছাড়েননি। পোশাক শ্রমিক বড় ভাই রক্ত জল করা বেতনে চালিয়েছেন ক্রিকেট একাডেমির খরচ। এখন তার পরিবার খানিকটা সচ্ছলতার মুখ দেখছে যে গরুর খামার দিয়ে, সেটা প্রতিষ্ঠা হয়েছে প্রিমিয়ার লিগে খেলে শরিফুলের পাওয়া কয়েক লাখ টাকা দিয়ে।
আমার নিজের জেলা কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার শাহীন আলমের পিতাও দিনমজুর। আগের রাতে খেলা দেখেছেন ছেলেকে টিভিতে দেখার জন্য। পরদিন যখন গোটা জাতি বিজয় উদযাপন করছে, তখন তাকে আবার যেতে হয়েছে ফসলের মাঠে। এই আমাদের ক্রিকেটারদের পরিবার!
মিডল অর্ডারের ব্যাটসম্যান শাহাদাত হোসেনের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ায়। ছেলেবেলা থেকেই সে ক্রিকেটপাগল। কিন্তু পিতৃহীন পরিবারের সঙ্গতি ছিল না তাকে ব্যাট কিনে দেওয়ার। ছেলের আবদার মেটাতে মা তাই কাঠ কেটে ব্যাট বানিয়ে দিয়েছেন। এমন আরও অনেক মা-ই হয়তো ছেলেকে কাঠ কেটে ক্রিকেট ব্যাট বানিয়ে দেন। তাদের মধ্যেই হয়তো লুকিয়ে আছে আগামী দিনের শাহাদাত।
আর অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক আকবর আলীর কথা বিশেষভাবে বলতেই হবে। মাঠে তার মেধা, স্থৈর্য, পেশাদারিত্ব এখন গোটা বিশ্বের আলোচনার বিষয়। ফাইনালের প্রতিপক্ষ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমও বলছে, ছেলে বটে! চাপের মুখে কীভাবে ঠান্ডা মাথায় খেলতে হয়, তাকে দেখে শেখা যায়! তার পরিবারও নিম্নবিত্ত, বাবা আসবাবপত্র ব্যবসায়ী। আকবরও সংগ্রাম করে ক্রিকেট শিখেছেন। খেলার ধার দেখে বিকেএসপিতে বিনা খরচে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু বাড়তি 'ট্র্যাজেডি' হচ্ছে, তিনি যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় খেলছেন, তখন তার একমাত্র বড় বোন সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান। রংপুর অঞ্চলের পারিবারিক সংস্কৃতি জানি। দূরে অবস্থানরত সদস্যকে দুঃসংবাদ দেওয়া হয় না। কিন্তু আকবর আলী সেই খবর পেয়েছিলেন। পেয়েও খেলা শেষ করে তবেই পরিবারের কাছে ফোন দিয়েছেন। এই ট্র্যাজেডির কাছে বেন স্টোকসের ট্র্যাজেডি কোথায় লাগে?
কেবল অনূর্ধ্ব-১৯ দল নয়, আমাদের জাতীয় দলেও এমন বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় রয়েছেন। মোহাম্মদ আশরাফুল, মোহাম্মদ রফিকরা একেকটি নজির। উল্টো চিত্রও রয়েছে। মাশরাফি বিন মুর্তজা যখন গৃহকর্মীর গ্রামের বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেন, তখন আরেক ক্রিকেটারের গৃহকর্মীকে নির্যাতনের বিচার চাইতে আদালতে যেতে হয়। মুশফিকুর রহিম বা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের 'ভায়রা' হওয়া যখন নিটোল প্রেম ও সখ্যের গল্প বলে; রুবেল কিংবা নাসিরের নারী কেলেঙ্কারিও জাতিকে হতাশ করে। ক্রিকেটারদের সমাজকর্ম যেমন সাধুবাদ কুড়িয়েছে, তেমনই অর্থের লোভে বাজির অন্ধকার গলিতে পা দেওয়ার অঘটনও ঘটেছে।
যদিও অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি করেছি আমরা, খাতা-কলমে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হতে এখনও কয়েক বছর বাকি। অর্থনীতিবিদরা বলেন- অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য কেবল সামর্থ্য নয়, অনুপ্রেরণাও দরকার। নানা সমালোচনা ও হতাশা সত্ত্বেও ক্রিকেট সেই অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলছে বাংলাদেশকে- অল্প অল্প গল্পগুলোর জোগান দিয়ে। সংগ্রামের গল্প, সাহসের গল্প, হার না মানার গল্প।
লেখক ও গবেষক
- বিষয় :
- ক্রীড়া ও সমাজ
