ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

রপ্তানির আগে চাই লাভ-ক্ষতির হিসাব

রপ্তানির আগে চাই লাভ-ক্ষতির হিসাব
×

এম এম আকাশ

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:১৪

সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে চাল রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি রপ্তানি কাজে উদ্বুদ্ধকরণে ১৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকারের ভর্তুকি প্রদানের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতানৈকের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ভোক্তাদের সংগঠন ক্যাবও রপ্তানির বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেছে। যদিও ব্যবসায়ী ও রপ্তানিকারকরা সরকারের সিদ্ধান্তে সমর্থন দিয়েছেন। চাল রপ্তানির আগে লাভ-ক্ষতির পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব হওয়া উচিত। সরকারি মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাল রপ্তানি করলে কৃষকের ন্যায্য দাম পেতে সহায়ক হবে। কিন্তু বাস্তবে কৃষকরা ঠিক কতটুকু লাভবান হবেন, সে বিষয়েও গবেষণা হওয়া দরকার। কারণ গবেষকরা ইতোমধ্যে গবেষণা করে দেখিয়েছেন, চালের দাম বাড়লেই ধানের দাম বাড়ে না। ধানের দাম তখনই বাড়ে, যখন বাড়তি চাল সরবরাহে নতুন করে বাড়তি ধানের চাহিদা সৃষ্টি হয় চালকল মালিকদের পক্ষ থেকে। এ ছাড়া কৃষক যদি ধান সংরক্ষণ করতে পারেন এবং নিজস্ব সমবায়ের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারেন, তাহলেও ভালো দাম পেতে পারেন। সে জন্য কৃষককে গুদাম তৈরি করে দিতে হয় এবং কৃষকদের যৌথ সংগঠন গড়ে তুলতে হয়। এগুলো না করে কৃষকরা ধানের ন্যায্য দাম পাবেন, এ ধারণা পোষণ করা সঠিক নয়। কারণ বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, কৃষকরা কম দামে ধান বিক্রি করলেও বাজারে চালের দাম কমে না। ভোক্তাদের চড়া দামেই চাল কিনতে হয়। এতে বরাবরই লাভবান হন ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।

অন্যদিকে ভোক্তারা আশঙ্কা করছেন, রপ্তানি করলে চালের দাম নাগালের বাইরে যেতে পারে; সেটা সত্য হতে পারে, যদি চালের রপ্তানি শুধু সুগন্ধি চালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। তবে সুগন্ধি চালের দাম বাড়লেও অধিকাংশ ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। যারা বেশি দামে কিনে খেতে পারেন, তারাই রপ্তানি বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করুন। মোটা চাল রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকারকে খুব সাবধানে অগ্রসর হতে হবে। রপ্তানির সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকারকে তিনবার ভাবতে হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যৌথ বৈঠক করতে হবে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য চাহিদা এবং খাদ্য নিরাপত্তা- এই তিন দিক সুনিশ্চিত করেই রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এক বা দুই মৌসুমের উদ্বৃত্ত দেখে মোটা চাল রপ্তানি করার সিদ্ধান্ত সঠিক হবে না। রপ্তানির আগে আমাদের বর্তমান মজুদের পরিমাণ জানার পাশাপাশি কয়েক মাস পরে পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, তারও সুস্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। সেই সঙ্গে দুর্যোগ, খরা, বন্যা ইত্যাদি বিষয়েও সজাগ থাকতে হবে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল মজুদ না রেখে রপ্তানি করা হলে যে কোনো সময় দেশের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু নতুন রপ্তানি নীতিতে বলা হয়েছে, সরকার চাল রপ্তানিকারকদের রপ্তানিতে উৎসাহ সৃষ্টির জন্য ভর্তুকি দেবে। এ কথা সবারই জানা যে, এই ভর্তুকি জুটবে বৃহৎ অটোমেটিক চালকল মালিকদের কপালে। আমরা দেখেছি, প্রাণ বা বসুন্ধরার মতো বড় অটোমেটিক ধান প্রসেসররা ইতোমধ্যে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। সরকার অবশ্য বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি চালকল মালিকদের জন্য কোটা তৈরি করে চালের নিশ্চিত ক্রয় সুবিধা কিছু পরিমাণে দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, যদি সরকার এই ছোট ও মাঝারি চালকল থেকে আরও বেশি চাল সংগ্রহ করত এবং ধানের সংগ্রহ মূল্য সেই চালের দাম অনুসারে আগে থেকেই নির্ধারণ করে কৃষকদের জানিয়ে দিতে পারত, তাহলে হয়তো কৃষকরা সেই সংগ্রহ নীতি ও দাম নীতি বা ভর্তুকি থেকে চুইয়ে পড়ে হলেও কিছু সুবিধা পেতেন। যেহেতু রপ্তানির উদ্দেশ্য উৎপাদক দেশি কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, তাই সবার আগে চাল সংগ্রহ ব্যবস্থাপনাও সঠিক হওয়া দরকার। সরকারের উচিত হবে ধানের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া এবং নির্ধারিত মূল্যে ব্যবসায়ী বা রপ্তানিকারকদের ধান সংগ্রহ করতে উৎসাহিত করা। এ জন্য প্রয়োজন হলে সরকারকে কঠোর হতে হবে। অন্যথায় আগের মতোই সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে পারে। এ ধরনের কিছু হলে রপ্তানিতে কৃষকের কোনো লাভ হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না।

আবার গত বছর ভর মৌসুমে কৃষক যখন ধানের দাম ঠিকমতো পাচ্ছিলেন না, তখন সরকার ও প্রশাসন বাধ্য হয়ে রাজনৈতিক সমর্থন ভিত্তি অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকেও ধান ক্রয় করেছিল। ধান কাটার মৌসুমে গ্রামীণ মজুরের মজুরি অত্যধিক হারে বৃদ্ধির কারণে আমরা তখন দেখেছি, অনেক কৃষক ধান কাটার পর ধান বিক্রি করে পোষাতে পারেননি। কোনো কোনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রনেতা তখন কাস্তে নিয়ে ধান কেটে কৃষকের সঙ্গে প্রতীকী একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু এ ধরনের মহৎ উচ্ছ্বাসে অর্থনৈতিক সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান হয় না। এ জন্য আইন, নীতিমালা, প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ভারতের অল্প্রব্দপ্রদেশের চাষিরা কীভাবে বাজার থেকে ধানের ন্যায্যমূল্য সংগ্রহ করেন, আফ্রিকার কফি বিক্রেতারা কীভাবে ন্যায্যমূল্য সংগ্রহ করেন এবং সেখানে ই-মার্কেট মধ্যস্বত্বভোগীদের সরিয়ে দিয়ে শহুরে ক্রেতা ও দেশি কৃষিপণ্য উৎপাদকের মধ্যে সরাসরি ইলেকট্রনিক যোগাযোগ সৃষ্টি করতে পারে; তা আমরা যেমন জানি না, তেমনি আমাদের সরকারও জানে বলে মনে হয় না। অবশ্য কৃষক নিজেরা যদি সচেতনতার সঙ্গে উদ্যোগী হতেন, মিছিল-মিটিংয়ের পরিবর্তে বা তার পাশাপাশি ইতিবাচক সমাধানের লক্ষ্যে নিজেদের বাজার সমবায় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতেন, তাহলে হয়তো কিছুটা সমাধান হতো। তখন সরকার চাষিদের জন্য গুদাম-ড্রায়ার ও ধান ভানা যন্ত্রের ব্যবস্থাও করে দিতে পারত। কৃষকের সমবায় অফিসে কম্পিউটার থাকত এবং তাদের পণ্য পরিবহনে যানবাহনও থাকত। আমার ধারণা, ঢাকার আশপাশের সবজি উৎপাদক চাষিরা হয়তো সে ধরনের অনানুষ্ঠানিক সমবায়ভিত্তিক বাজার স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে ইতোমধ্যে চালু করেছেন। তবে তাদের আরও পর্যাপ্ত হিমাগার প্রয়োজন। চাল রপ্তানির সিদ্ধান্তের আগে আমাদের লাভ-ক্ষতির হিসাবটা ভালোভাবে করতে হবে। মনে রাখতে হবে অতীতের কথাও।

সরকার যদি আন্তরিকভাবে কৃষকের মঙ্গল চায়, তাহলে ধনী বিক্রেতা ও রপ্তানিকারকদের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা না করে তার উদারতা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং উৎপাদক চাষিদের সমবায়ের জন্য প্রসারিত করা উচিত। মুজিববর্ষে সম্ভবত মুজিবকে প্রকৃত ভক্তি প্রদর্শনের জন্য এটাই হতে পারে একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।

অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×