ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

হাজারো ঋদ্ধ তৈরি করতে...

হাজারো ঋদ্ধ তৈরি করতে...
×

তৃষ্ণা সরকার

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:১৬

ধানমন্ডি লেকে ডুবে গিয়ে আমার একমাত্র ছেলে ঋদ্ধের অকালপ্রয়াণ ঘটবার পর আমি কোনো কিছুতেই মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। গত ২৯ সেপ্টেম্বর আমার ছেলে হৃদয়ঙ্গম ঋদ্ধ চলে যাওয়ার পর সবকিছু শূন্য হয়ে এসেছিল। শূন্যতা ও হাহাকার আমাকে ঘিরে ধরে, দিশেহারা করে তোলে। বেসরকারি সংস্থায় নিয়মিত ১৮ বছর কাজ করলেও ২০১৩ থেকে আমি ফ্রিল্যান্সিং ওয়েতে ট্রেনিং, অ্যাক্টিং, কাউন্সেলিং, ডাবিং, ইয়োগা ও মেডিটেশনের কাজ করে আসছিলাম। ঋদ্ধ আমাকে এমন শূন্য করে দিয়ে গেল যে কোনো কাজেই মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। আমার বাবু আমাকে ছেড়ে যায়নি, শুধু দেহত্যাগ করেছে- এটুকু যখন অনুভব করতে পারল এই প্রাণ, তখন থেকে আমি আমার সব প্রফেশনাল কাজে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করলাম, কাজও করে যাচ্ছি ঠিকঠাক। কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে যায়, কোনো কাজই আমায় খুব একটা টানে না।

গত ২২ ডিসেম্বর বাবুর বন্ধুরা ওর জন্য স্মারকগ্রন্থ বের করবে বলে এসে বসল বাবুরই ঘরে। দেখলাম ওদের সংস্পর্শে আমি নতুন প্রাণ পাচ্ছি। বাবুর প্রিয় খাবার মমো আমার মেয়ে খেতে চাইল বলে অনেক কষ্ট সত্ত্বেও বানালাম। এরপর এই মমো বানানোর ঘটনাটা সোশ্যাল মিডিয়াতে লিখলাম। মানুষের উৎসাহে একটা পেজ খুলে মমো বানাতে শুরু করলাম আর অনলাইনে সেল করতে শুরু করলাম। এদিকে মেয়েকে কোথাও একা ছাড়তে প্রাণ সায় দেয় না বলে মেয়েকে স্কুলে দিয়ে বাইরে বসে না থেকে কাছেই এক বন্ধুর বুটিক হাউসের এক কর্নারে মমো আর নানা রকম চায়ের আড্ডার জন্য কাজ শুরু করলাম। যদিও আমার সম্পর্কে ছোট বোন-বন্ধু খুব করে চাইছিল আমি যাতে সারাক্ষণ কাজে ব্যস্ত থাকি।

এর মধ্যে স্মারকগ্রন্থের লেখা হাতে এলে ছাপার জন্য কোটেশন সংগ্রহ করে দেখলাম অনেক টাকা লাগবে এটা প্রকাশ করতে। এত টাকা কে দেবে? টাকা নেই বলে আমার বাবুর বন্ধুদের সঙ্গ তো ছাড়া যাবে না, ওদের সঙ্গ আমায় নবপ্রাণের উপস্থিতি জানান দেয়। তাই ভাবলাম, ওরাও তো বড় হবে, পড়াশোনা করতে দূরে চলে যাবে, কেউ কেউ নিশ্চয়ই দেশের বাইরেও চলে যাবে। আমি তো বাঁচব না, যদি আরও সব শিশুর জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম করা যায়, তাহলে আমি ওদের নিয়ে বাঁচতে পারি। তাই শিশুদের কিছু না বলেই একদিন মমো আর চায়ের আড্ডার ফাঁকে ফাউন্ডেশনের ধারণাপত্র লেখা শুরু করলাম। লেখা শেষ হলে বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে বাবুর ঘরে বসে শেয়ার করলাম। সবাই খুব খুশি হলো আর বলল- আমরা তো এমন কাজই করতে চাই।

এভাবেই এক হলাম। তারপর সবাইকে সংক্ষিপ্ত লেখা ইনবক্স করলাম। সবাই বলল- খুব ভালো উদ্যোগ, আমি যদি শুরু করি সবাই যে যার মতো পাশে থাকবে। খুব অনুভব করলাম, এই কাজটাতে হাত দেওয়ার পর আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছি, আমি চেষ্টা চালাচ্ছি নতুনভাবে সব ঋদ্ধকে নিয়ে বেঁচে থাকবার। অন্য শিশুদের সঙ্গে আমার স্বপ্ন এক করে কীভাবে কাজটি নিয়ে পথ চলা যায়? একা পারা সম্ভব নয়, তাই সবাইকে পাশে চাই। সরাসরি পাশে, কাজের মাধ্যমে। মানসিক সমর্থন তো প্রয়োজন। আর্থিক সমর্থনও জরুরি। যখন যেভাবে প্রয়োজন সেভাবে সাধ্যানুযায়ী সবার সঙ্গ-সমর্থন চাই। আশা করি সঙ্গে পাব, দেশের ও দেশের বাইরের বন্ধুদের। যে যেভাবে চাইবে তাকে সেভাবে সাধ্যানুযায়ী কাজে যুক্ত করতে চাই। আশা করি, ১৭ ফেরুয়ারি সোমবার দিনটি আমাদের সঙ্গে থাকবার জন্য সঞ্চয়ে রাখবেন। ওই দিন অকালপ্রয়াত ঋদ্ধ স্মরণে ঢাকার শংকরে ছায়ানট মিলনায়তনে 'হৃদয়ঙ্গম ঋদ্ধ' অঙ্কন উৎসব ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ঋদ্ধ স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের উদ্যোগে বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে উৎসবটি রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত চলবে। আমার বাবু ঋদ্ধ ছিল সৃজনশীল, মানবিক, প্রকৃতিপ্রেমী ক্ষণজন্মা এক বালকের প্রতিচ্ছবি। ঋদ্ধের মতো হাজারো ঋদ্ধ তৈরি করতেই এই উদ্যোগ। আসুন, শুনুন, ভাবুন, তারপর বলুন, এই সময়ে কতটুকু উপযোগী হয়ে উঠবে এই ঋদ্ধ ফাউন্ডেশন।

উন্নয়ন ও সংস্কৃতিকর্মী

আরও পড়ুন

×