ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

প্লেটোর প্রেমতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা

প্লেটোর প্রেমতত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা
×

জয়া ফারহানা

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:১৭

লিবিডোকে অনুবাদ করলে যে ধারণা পাওয়া যায়, তাতে যতটা কামবোধ থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে মানসিক তাড়না। হয়তো সে জন্য নির্দিষ্ট করে নেওয়া দরকার লিবিডোমাত্রই জৈবিক তাড়না নয়। এই ব্যাখ্যা দেওয়ার কারণ হয়তো সেই চিরকালীন মধ্যবিত্তীয় সংস্কার। যে সমাজে ইন্দ্রিয়নির্ভর প্রেম অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, সে সমাজের একজন হিসেবে এই সংস্কার দোষের কিছু নয় নিশ্চয়ই। এমন এক সমাজে থাকি আমরা, যেখানে ইন্দ্রিয়নির্ভর প্রেম দূষণীয়, অপরাধ। এখানে পরস্পরের প্রতি তীব্রতম কটূক্তিও গ্রাহ্য; কিন্তু প্রেম অগ্রাহ্য, অশ্নীল। এমনকি তা যদি প্লাটনিক প্রেম হয়, তবুও। প্লাটনিক প্রেমের স্বীকৃতি আছে সমাজে? নেই। নেই বলেই প্লাটনিক প্রেমের কোনো বাংলা প্রতিশব্দও নেই অভিধানে।

নিস্কাম প্রেম শব্দটি দিয়ে আমরা প্লাটনিক প্রেমকে কোনোমতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। কিন্তু নিস্কাম শব্দটিও কি যথাযথ? কোনো প্রেমই কি নিস্কাম হতে পারে? কোনো না কোনো কামনা তো থাকেই। একেবারে নূ্যনতম হলেও শুভকামনা। কখনও সরাসরি, কখনও বিমূর্ত পন্থায় প্রেমাস্পদের মনোযোগ কাড়ার চেষ্টা। প্লাটনিক প্রেমের নিরবচ্ছিন্ন প্রচারক শেলির বিখ্যাত জেন উইথ গিটার কবিতাটির কথা মনে করতে পারি। মনে করতে পারি সেই উর্দু কবিতাটিও- 'ইস তনহাইমে মুঝে রাহত দেতি হ্যায় হাওয়া/ উসনে তেরি জিসম চুম কর আয়েঁ হ্যায়'-এই শূন্যতার মধ্যেও আমি একটু শান্তি পাচ্ছি শুধু ওই হাওয়ার কাছ থেকেই। কারণ সে যে তোমাকে ছুঁয়ে এসেছে। প্রায় কাছাকাছি অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বাংলা ভাষার কবি কাজী নজরুল। 'শিস দিয়ে যায় উদাম হাওয়া লেবু ফুলের আতর মেখে।' রানু সোম নামের এক কিশোরীকে নিজ হাতে আতর মাখানো গানের খাতা উপহার দিয়েছিলেন নজরুল। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত সেই খসড়া খাতায় দেখা যাচ্ছে, রানু সোম বা প্রতিভা বসুকে নিয়ে নজরুল লিখেছেন অসংখ্য কবিতা ও গান, যার সবটাই প্লাটনিক।

অনেকেই মনে করেন, প্লাটনিক প্রেমের তত্ত্ব পশ্চিমে তৈরি হলেও এর মর্মার্থ প্রাচ্যই বুঝেছে বেশি। তাদের মোক্ষম যুক্তি প্লেটোর প্রেমতত্ত্বকে সৃজনশীল নানা মাধ্যমে সামনে এনেছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রেমের দুনিয়ায় প্রেমিকার চুলের কাঁটাও অমূল্য। 'চিরকুমার সভা'য় নীরবালা কিংবা নৃপবালার চুলের কাঁটা কীভাবে চিরকুমার সভার সদস্যকে প্রেমের জলোচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে নিয়েছিল, পাঠক হিসেবে দেখেছি। প্রেমাবস্থার বিশেষ কোনো পরিণতির কথা না ভেবে দেহাতীত যে প্রেম, তা কি অন্যান্য প্রেমের চেয়ে মহান? উত্তর তর্কসাপেক্ষ। কেননা, এই প্রাচ্যেই প্রেমের দেবতা শ্রীকৃষ্ণ। যার নাকি রাধার সঙ্গে পরকীয়া, রুক্মিণীর সঙ্গে স্বকীয়া, পাণ্ডবপত্নী কৃষ্ণার সঙ্গে ইন্দ্রিয়রহিত প্রেম আবার সখী পাঞ্চালীর সঙ্গে মধুর আবেগের সম্পর্ক। সেই প্রাচ্যে প্লাটনিক প্রেমকে নিঃশর্তে মহান বলার সুযোগ নেই।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি নন-ফিকশনের কথা মনে পড়ছে। যেখানে তিনি তার এক বিত্তবান বন্ধুর কথা বলছেন, যার বিশাল ব্যবসা, প্রাসাদোপম বাড়ি, কয়েকখানা গাড়ি, রূপসী স্ত্রী, ফুটফুটে দুটি সন্তান। বিদেশি হোটেলের এক লবিতে বসে সুনীলকে তিনি বলেছিলেন, আমার যা টাকা আছে এক্ষুনি এ হোটেলটা আমি কিনতে পারি। যা ইচ্ছা করে সবই পেতে পারি। কিন্তু সেই যে রোশনি আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাই কোনো কিছুতেই স্বস্তি পাই না। নারী ও পুরুষের প্রেমের মধ্যে এমন কিছু থাকে, যা স্পর্শ করার চেষ্টা করলে কেবল শূন্যতাই পাওয়া যাবে। প্রকৃত প্রেম তাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ব্যাখ্যায়- 'হয়তো কিছুই নাহি পাবো, তবুও তোমায় আমি দূর হতে ভালোবেসে যাবো।'

প্রেম ভিন্নমাত্রা যোগ করতে পারে রাজনীতির মতো কঠিন বিষয়েও। পুঁজিতন্ত্রের সঙ্গে ফিদেল কাস্ত্রোর ধ্রুপদি বিরোধিতার কথা জানে বিশ্ব। কিন্তু মার্কিন ব্যান্ড বিটলসের তারকা শিল্পী জন লেননের যে নিখুঁত ভাস্কর্য হাভানার পার্কে আছে, তা গোটা মার্কিন দেশেও নেই। জন লেননের ভাস্কর্যের সামনে ধ্যানমগ্ন গুণমুগ্ধ কাস্ত্রোর বসে থাকা ছবি ছাপা হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। কিউবার প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা বাধা হয়ে দাঁড়াতেই পারেনি কাস্ত্রোর সংগীত ও সুরের প্রেমের কাছে। প্রেম পিথাগোরাসের অঙ্ক নয় তাই মোটেও। বিজ্ঞানের কাছে প্রেম নিউরো হরমোনের খেলা। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন- লোকে যখন প্রেমে পড়ে, তখন মস্তিস্কে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসরণের কারণে সারাদিন ভালো লাগার অনুভূতিতে ভরে থাকে শরীর, ফুরফুরে থাকে মন। হতে পারে সে প্রেম কারও জীবনে আসে ম্যাডোনার মতো মাতৃমূর্তিরূপে, কারও জীবনে অ্যাফ্রোদিতির মতো প্রেমিকার রূপে, কারও কাছে ভেনাসের রূপে। চারপাশে এত অসহিষুষ্ণতা-অসহনশীলতা! তবে কি কারও মস্তিস্ক থেকে অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ হচ্ছে না?

লক্ষ্য করার বিষয় এই, বাংলাভাষীদের কাছেই লাভ ম্যারেজ শব্দটি কিন্তু বিশেষ পরিচিত। মানে দাঁড়াচ্ছে, 'লাভ' থাকলে ম্যারেজ হতেই হবে। এখানে প্লাটনিক প্রেমের জায়গা নেই। সমাজ বোধহয় প্লাটনিক প্রেমকে একটু সন্দেহের চোখে দেখে। কী কারণ থাকতে পারে এর পেছনে? হতে পারে, আমরা অধিকাংশ থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড় টাইপ। এখানে প্রেমের প্যাটার্নও একটাই। মুগ্ধতা, প্রেম, বিয়ে। যে সমাজে সম্পর্কের মুগ্ধতার শুরু চেহারার আকর্ষণে, আবিস্কার পর্ব ইন্দ্রিয় নির্ভরতায় এবং সমাপ্তি বিয়েতে, সে সমাজে প্লাটনিক প্রেমের জায়গা কোথায়? ব্যতিক্রম আছে নিশ্চয়ই। কেউ হয়তো মনে করিয়ে দিতে চাইবেন, বৈষ্ণব পদকার চণ্ডীদাসের সেই অমিয় বচন- 'রজকিনী প্রেম, নিকষিত হেম, কাম গন্ধ নাহি তায়।' যুক্তি দেখাবেন, রবীন্দ্রপ্রেমী বাংলাভাষীর প্রেমাস্পদের প্রতি অনিবার্য উচ্চারণ 'ভালোবেসে সখী নিভৃত যতনে আমার নামটি লিখ তোমার মনের মন্দিরে।' লক্ষ্য করবেন, ইন্দ্রিয়াতীত এই পঙ্‌ক্তিগুলো কিন্তু রচিত হয়েছে বিরহ থেকেই। পরিণতির আকাঙ্ক্ষা ছিল, কোন কারণে পরিণতি পরিণয় পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেনি। তাছাড়া এক রবীন্দ্রনাথ বা একজন চণ্ডীদাসের ইন্দ্রিয়াতীত কিছু কবিতার পঙ্‌ক্তি বাংলাভাষীদের ইন্দ্রিয়রহিত প্রেমের সাধারণ প্রবণতা প্রমাণ করে না। বিপরীতটি বলা বরং সহজ যে, প্লাটনিক প্রেমের অসীম সৌন্দর্য, উষসী আলোর মতো প্রায় অধরাই থেকে গেছে বাঙালির জীবনে। আরেকটু সাহস করে বললে বলা যায়, প্লাটনিক প্রেমের মর্মই বোঝে না আজকের প্রজন্ম। তাই প্লাটনিক প্রেম প্রায় বিলুপ্তির পথে। ক্রমেই প্রেমের প্রধান উপাদান হয়ে উঠছে ঈর্ষা, সন্দেহ, অবিশ্বাস, শেষমেশ আক্ষেপ। সেই যে পূর্বসূরি কবি লিখে গেছেন- 'সখী কেমনে ধরিব হিয়া, আমার বধূ আনবাড়ি যায় আমারই আঙিনা দিয়া'। কেউ কেউ মন্তব্য করেন, প্লাটনিক প্রেমের জায়গা কেবল সাহিত্যের পাতায়, চলচ্চিত্রের পর্দায়। এমনকি খোদ প্লাটনিক প্রেমের তাত্ত্বিক প্লেটোর প্রেমকেও এই শ্রেণি নিস্কাম প্রেম বলতে নারাজ। তাদের ব্যাখ্যায় প্লেটো এবং দিওতিমার উপায় ছিল না বলেই একটি ইউটোপিয়ান ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন প্লেটো। জানেন নিশ্চয়ই ৪২৮ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে সক্রেটিসের প্রিয় শিষ্য প্লেটোর দেওয়া তত্ত্বই ধ্রুপদি অর্থে প্লাটনিক লাভ। গুরু সক্রেটিসের সঙ্গে প্রেম বিষয়ে প্লেটোর যে আলোচনা চলত, সেখানে দিওতিমা নামের একজন বিদুষী নারীও অংশ নিতেন। শোনা যায়, দিওতিমাকে ভালোবাসতেন প্লেটো, দিওতিমাও প্লেটোকে। পরিণতির কথা না ভেবে দিওতিমা এবং প্লেটোর যে ভালোবাসা, সেখান থেকেই এসেছে প্লাটনিক লাভ।

প্লাটনিক হোক কিংবা হোক বায়োলজিক্যাল, লিবিডো ভালো অন্তত থ্যানাটোসের চেয়ে। প্রেম যদি হয় 'দুর্গেশ নন্দিনী'র আয়েশার মতো, তবে তো সব মুশকিলই আসান। পাঠানকন্যা আয়েশার হাতে বন্দি শত্রুপক্ষের জগৎ সিংহকে পরম যত্নে শুশ্রূষা করে বলেছে, এই বন্দি আমার প্রাণেশ্বর। জগৎ সিংহকে লেখা চিঠিতে আয়েশা লিখছে, ভালোবাসা ভুলে যাও। সুখে নয়, দুঃখে আমাকে ডাক দিও। আমি পাঠানকন্যা সব কষ্ট বুকেই ধারণ করি, পিঠে নয়। দুর্গেশ নন্দিনীর প্রেক্ষাপট আজও প্রাসঙ্গিক। তবে আয়েশারা কি আছে?

কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×