স্বাস্থ্য খাত
বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা ও পদক্ষেপ
ডা. কামরুল হাসান খান
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৪
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন- একটি স্বাধীন, সার্বভৌম সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার। বঙ্গবন্ধু একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশ গড়ার পাশাপাশি দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের কল্যাণে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। বাংলার মানুষের সাংবিধানিক, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে প্রাধান্য দিয়েছেন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। এ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তিনি গ্রহণ করেছিলেন সব রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রীয় নীতিমালা। বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন, একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়তে হলে চাই একটি স্বাস্থ্যবান জাতি। এ জন্য তিনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তেমনি গ্রহণ করেছিলেন সময়োপযোগী পদক্ষেপ। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে একটি শক্ত নীতিমালা, পরিকল্পনা, অবকাঠামো রেখে গেছেন, যার ওপরে গড়ে উঠেছে আজকের বিশ্বনন্দিত অনেক কার্যক্রম।
আমরা যদি মানুষের অধিকার কিংবা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকেও বঙ্গবন্ধুর এই ভাবনা-পদক্ষেপের অর্থাৎ সুস্থ-সবল জাতি গঠনের বিষয়ে মূল্যায়ন করি, তাহলেও এ কথা বলতে হবে, এ ক্ষেত্রে এসবেরই যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বরাবর মানুষের অধিকার রক্ষায় কতটা সোচ্চার ছিলেন, তা তার কর্মময় রাজনৈতিক জীবন পাঠেই পরিস্কার হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের বাইরেও ব্যক্তিজীবনের যে আদর্শ কিংবা মহানুভবতা লক্ষ্য করা যায়, তা নতুন ধরনের জীবনবোধের উন্মোচন ঘটায়। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা-পদক্ষেপে এরই সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে হলে এসব কিছু গুরুত্বের সঙ্গে সামনে রেখেই আমাদের এগোতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে কতটা নিষ্ঠ-সজাগ-সচেতন, তা তার কর্মধারার মধ্যে স্পষ্ট।
স্বাধীনতা অর্জনের পর আমাদের পরিস্থিতি সব ক্ষেত্রেই ছিল বিপর্যস্ত। সেই থেকে দ্রুত উত্তরণের পথ রচনা করেন বঙ্গবন্ধু। সদ্য স্বাধীন বিধ্বস্ত, কপর্দকহীন দেশে বঙ্গবন্ধু যখন দেশ ও দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য অহর্নিশ দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, পরিশ্রম করে চলেছেন, তখনও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষাক্ষেত্রকে প্রাধান্য দিতে ভোলেননি। শত ব্যস্ততার মধ্যে ১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তৎকালীন আইপিজিএমআরে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ উদ্বোধন করতে এসে দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষা নিয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তার ওই ভাষণে সদ্য স্বাধীন দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিয়ে এক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। ওই ভাষণে তিনি দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা শিক্ষার পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা, ভাবনা মন খুলে বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ধ্যান-জ্ঞান-কর্মে সবসময় ছিল গরিব-দুঃখী মানুষ। তিনি এসব মানুষের জীবনমান উন্নত করার নিরন্তন প্রয়াস চালিয়েছেন অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও। তিনি চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবাইকে গরিব রোগীদের মমতা দিয়ে চিকিৎসা প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি চিকিৎসক-নার্স-কর্মচারী সবাইকে সম্মিলিতভাবে চিকিৎসা প্রদানে আন্তরিকভাবে মনোনিবেশ করার আহ্বানও জানান। তিনি নার্সদের সম্মানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। সবাইকে নার্সদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের অনুরোধ জানান। নার্সিং শিক্ষার সুযোগ ও মান বৃদ্ধির জন্য বিশেষ তাগিদ দেন। কার্যক্ষেত্রে এর প্রতিফলনও দেখা গেছে। 
চিকিৎসা একটি সম্মিলিত ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে কাজ করার অনুরোধ জানান বঙ্গবন্ধু। দেশের গরিব-মেহনতি মানুষ যেন সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা পায়, সেদিকে সংশ্নিষ্ট সবাইকে বিশেষ দৃষ্টি রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন। উল্লেখ্য, নির্দেশনা প্রদান করেই তিনি থেমে থাকেননি, এসব বাস্তবায়নের দিকেও বিশেষ দৃষ্টি রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনার সফল প্রতিফলন আজকের বাংলাদেশে দৃশ্যমান। বঙ্গবন্ধুর তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার জন্য থানা স্বাস্থ্য প্রকল্প আজও বিশ্বে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার এক সমাদৃত মডেল। বঙ্গবন্ধুর পদক্ষেপের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- ১. আইপিজিএমআরকে (পিজি হাসপাতাল) শাহবাগে পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল হিসেবে স্থাপন; ২. বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি) প্রতিষ্ঠা; ৩. বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন্স (বিসিপিএস) প্রতিষ্ঠা; ৪. স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন; ৫. ১৯৭৩ সালে প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাকে অধিকতর গুরুত্ব প্রদান; ৬. চিকিৎসকদের সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির মর্যাদা প্রদান; ৭. নার্সিং সেবা এবং টেকনোলজির উন্নয়নে সংশ্নিষ্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা ও নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ; ৮. উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলনীতি হলো :'প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর'- এ নীতিকে বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি স্থাপন করেছিলেন নিপসম (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেন্টিভ ও সোস্যাল মেডিসিন)।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর সুদীর্ঘ ২১ বছর চলেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত ধারায় পাকিস্তানি ভাবধারা অনুসরণ করে। এ কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সব উন্নয়ন ব্যাহত হয়, বঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষ। দেশে বিএমএর নেতৃত্বে চিকিৎসকদের দীর্ঘ তুমুল আন্দোলন হয়েছে। ডা. মিলন জীবন দিয়েছেন গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের জন্য। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দায়িত্ব গ্রহণ করার পর চিকিৎসকদের কোনো আন্দোলন করতে হয়নি। সমস্যা-সংকট কিংবা জটিলতার বিষয়গুলো তার নজরে আনলেই সেসব বাস্তবায়ন করতে ত্বরিত পদক্ষেপ নিয়েছেন, নিচ্ছেন। চিকিৎসকদের সব দাবিই পূরণ হয়েছে। বাস্তবায়ন হচ্ছে গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সব কার্যক্রম। আমাদের স্বাস্থ্য খাতে ইতোমধ্যে অর্জন কম নয়। বর্তমান সরকার টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় এসে এ খাতে আরও বিশেষ নজর দিয়েছে। আমাদের সীমাবদ্ধতার মাঝেও এই যে অর্জন, তা অবশ্যই সরকারের দূরদর্শিতারই প্রতিফলন। সুদীর্ঘ ২১ বছর লড়াই-সংগ্রাম-নির্যাতনের পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা বাবার আজীবন লালিত স্বপ্ন সোনার বাংলা গড়ার কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে সরকার পরিচালনায় নিষ্ঠ রয়েছেন। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অগ্রগণ্য। দেশের মানুষ, চিকিৎসক সমাজসহ সব শ্রেণি-পেশার প্রস্তাব-পরামর্শ গ্রহণ করে তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। দেশে একটি গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কার্যকর কিংবা বাস্তবায়নে নিরলস প্রচেষ্টার কথাও বিশেষভাবে আলোচনায় আছে।
জাতির পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ১৯৯৬ থেকে ২০০১ এবং ২০০৯ থেকে অদ্যাবধি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও মেডিকেল শিক্ষার সব ক্ষেত্রে যুগান্তকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় আজকে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ সমাদৃত। বাংলাদেশ বিশ্বে আজ অনেক ক্ষেত্রেই অনুসরণযোগ্য হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন-অগ্রগতির পরিসর হয়েছে বিস্তৃত। স্বাস্থ্য খাতও এর বাইরে নয়। আমরা যদি এসব বিষয়ে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে আলোচনা করি, তাহলে এই সত্য কিংবা বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো অবকাশ নেই। সুস্থ-সবল জাতি গঠনের কাজ এগিয়ে চলেছে এবং তা উত্তরোত্তর বেগবান হচ্ছে। এই চিত্র আমাদের আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরই স্বপ্ন দেখায়।
অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- স্বাস্থ্য
