নারীকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে নদীকে
আইরিন সুলতানা
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২০ | ১৫:০৪
জন্মকে জঠরে ধারণ করার বিস্ময়কর ক্ষমতা কেবল নারীর আছে। বহতা জলে সিঞ্চিত হয়েছে যত ভূমি, সভ্যতা জন্মেছে সেখানে। বিদ্যা আর কলার বরে মানুষের আত্মাকে নবজন্ম দেন সরস্বতী। সরস্বতী একাধারে দেবী, মা আর নদী। সরস্বতী নারী। নারী নদী। সব নদী তো নারী।
জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় লিখেছেন, 'দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল কুয়াশার।' নারী, নদী অথবা সরস্বতী এভাবেই আশীর্বাদ ছড়িয়ে দেয় পৃথিবীর বুকে। এই আশীর্বাদ ধরে রাখার দায় রয়েছে মানুষের। সমাজ, সভ্যতা আর পৃথিবীর এগিয়ে যাওয়ার গোপন মন্ত্রটি তো এই। বাস্তবে যদিও এই মন্ত্র হেলাফেলায় ধুলায় যাচ্ছে গড়াগড়ি।
নারীর অধিকার নিয়ে কয়েক যুগ আগে আওয়াজ তুলেছিলেন বেগম রোকেয়া। তিনি নারীর বিদ্যার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছেন; যেন খোদ বিদ্যাদেবী সরস্বতী ধরাধামে নারীদের আলো দিয়ে গেলেন। নারী অধিকার নিয়ে বিশ্ব এখনও কথা বলে। কিন্তু বিশ্ব নারীকে কিছু দিতে পারেনি; বরং প্রাপ্য অধিকার, স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে নিতে নারীর অস্তিত্ব বিপন্নই। বিশাল মনের জোর নিয়ে টিকে আছে নারী এই বৈরী বিশ্বে। নদীর গল্পটাও তাই। দখল করে, দূষণ করে নদীকে অন্তঃসারশূন্য করে দিচ্ছে মানুষ। নদীও যে জীবন্ত সত্তা, তা প্রতিষ্ঠা করতে আদালতে যেতে হয় এখন। নারীরও যে আর সব মানুষের মতো ইচ্ছা-অনিচ্ছা নিয়ে পথচলার অধিকার আছে, তা প্রতিষ্ঠা করতেও আইনের আশ্রয় নিতে হয়।
নদী ও নারীকে যুদ্ধ করেই টিকতে হচ্ছে। কবে যেন খবরে পড়েছিলাম, স্বামীর নির্যাতন সইতে না পেরে সাঁতরে নদী পেরিয়ে থানায় গিয়ে উঠেছিলেন এক নারী। নদীও এমন করে ফুঁসে ওঠে মাঝেমধ্যে। অবৈধ ড্রেজিং আর নদীর গতিপথ জোর করে পরিবর্তনে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মাও ক্ষেপে উঠেছিল তাই। স্রোতের বিপরীতে, স্রোতের গতিপথে স্তম্ভ গেঁড়ে বড় বড় সেতুর সুবিধা তো নিচ্ছি আমরা; কিন্তু বিনিময়ে নদীটাই খোয়াচ্ছি। সেতু থেকে বাসে-ট্রেনে চলার সময় স্রোত দেখি না তাই; চোখে ভাসে ধু-ধু চর।
মানুষ যেমন নারীকে বোঝে না, তেমন নদীকেও বোঝে না। যে সরস্বতীকে পুজো দিচ্ছি, সেই দেবীর আদি সরস নদী রূপটিকেই তো ধরে রাখতে পারেনি মানুষ। এ সভ্যতা যে ভঙ্গুর হবে, তা ভবিষ্যদ্বাণী করতে দৈবশক্তি লাগে না তাই; স্রেফ নারী হলেই হয়। স্রেফ নদীই জানে, কোন আগুনের দিন আসছে আগামীর পৃথিবীতে। পরিবেশ, প্রতিবেশ, জলবায়ু সব বিপন্ন করে উন্নয়ন হবে না। নারীর অধিকারকে খর্ব করে কোনো উন্নয়ন সূচক হবে না সবুজ।
যে দেশের মানচিত্র নদী দিয়ে আঁকা, তার অর্থনীতির অন্যতম প্রবাহ হবে নদী। দেশের রাজধানী বুড়িগঙ্গার তীরে তার সব অবকাঠামো হবে নদীবান্ধব। যে দেশের শিরা আর ধমনি মানে নদীর স্রোত, সে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা মানেই তো নদী। ব্লু ইকোনমি যদি পুষ্ট করতে হয় তো আগে নদীর দিকে ফিরতে হবে পরিকল্পনাকারীদের। কারণ, নদীই সাগরে গিয়ে মেশে। সামাজিক আর রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সূচকও আগে বাড়বে যদি এই রাষ্ট্র নারীসত্তাকে স্বাধীনতা দিতে পারে। যে দেশে পুরুষ ও নারী জনসংখ্যা প্রায় সমান সমান, সে দেশে নারীকে সমঅধিকারের জন্য মিছিল-সমাবেশে দাঁড়াতে দেখাটা আহত করে। নদী বইবে- এ তো প্রাকৃতিক রীতি। নারী স্বাধীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে জীবনযাপন করবে, এও হতে হবে পরিবার-সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বাভাবিক রেওয়াজ। নদী আর নারীর গতিপথে বাধা শেষ পর্যন্ত সমাজ-রাষ্ট্রকে ছাপিয়ে একসময় পৃথিবীর বিপর্যয় ডেকে আনবে। সরস্বতী আমাদের তা বোঝার মতো জ্ঞান দিয়েছেন। সেই প্রজ্ঞা প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি পালনের সময় এখন মানুষের।
পুরুষের দৃষ্টিতে নারীকে অধিকার দেওয়ায় মঙ্গল সূচনা হবে না। নারীর কী চাই, তা বুঝতে হবে। বুভুক্ষু সভ্যতার খোরাক জোগাতে উন্নয়নে হাত দিলে হবে না, নদীর কী চাই তা অনুভব করেই সভ্যতার রাস্তা গড়তে হবে। এ সবকিছুতে পুরোটা জুড়ে রাজনীতি তো আছেই। নদী নিয়ে যে রাজনীতি, তাতে সীমান্ত-রাষ্ট্র এসব নিয়ে যত বেশি কথা হবে, তত নদীর প্রবাহের ভাগবাটোয়ারা হবে। নদীর যত ভাগাভাগি হবে, তত নদীর প্রাকৃতিক নেটওয়ার্কে ভাঙন ধরবে। নদীর এপার শুকনো হলে ওপারেও প্রবাহ আজ হোক, কাল হোক থেমে যাবেই।
যে সরস্বতী দেবী দুই বাংলায় পূজায় সিক্ত হয়, সে সরস্বতী দেবীর নদীর প্রবাহ যে পাড় দিয়েই বয়ে যাক না কেন, তা হারিয়ে ফেলার মতো বেদনা আর কী আছে! দেবীকে বুঝতে হলে নারীকে বুঝতে হবে। নারীকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে নদীকে। তবেই এ সভ্যতার ওপর আশীর্বাদ বর্ষণ হবে। তবেই হবে প্রকৃত উন্নয়ন মানুষের, সভ্যতার, সমাজের, রাষ্ট্রের, পৃথিবীর।
লেখক ও পরিবেশকর্মী
- বিষয় :
- আইরিন সুলতানা
- নারী
