ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

নারী দিবস

নিরাপত্তা হেফাজতে নারীর জীবন

নিরাপত্তা হেফাজতে নারীর জীবন
×

হাসিবুর রহমান

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২০ | ১৫:০৫

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের গেটের সামনে ২৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে আহাজারি করছিলেন কল্পনা বেগমের স্বজনরা। কয়েকদিন ধরে পায়ের ব্যথায় ভোগা গৃহিণী কল্পনা বেগম ২৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কামরাঙ্গীরচরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য। সন্ধ্যার দিকে বাসায় না ফেরায় মোবাইল ফোনে কল দিলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাতভর ফোনটি বন্ধ থাকায় পরিবারের লোকজন চিন্তায় পড়ে যান। মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে ফোন দিলে কল্পনার নম্বরটি খোলা পান তার স্বজনরা। তখন এক ব্যক্তি তা রিসিভ করে নিজেকে পুলিশের লোক পরিচয় দেন এবং মৃত্যুর খবর জানান। মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের হাতে আটকের পর মারা যাওয়া কল্পনা বেগমের মৃত্যু সম্পর্কে কথাগুলো বলছিলেন তার মেয়ে আয়েশা আক্তার নূপুর। মৃতের ভাই বাচ্চু মিয়া আসক প্রতিনিধির কাছে অভিযোগ করেন, ভাগ্নির কাছ থেকে খবর পেয়ে তারা সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ছুটে আসেন। কিন্তু তাদের মৃতদেহ দেখতে দেওয়া হয়নি।

কল্পনা বেগমের মৃত্যুর বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ আসক প্রতিনিধিকে জানান, নূরজাহান রোডে একটি ফ্ল্যাটে যৌন ব্যবসা হচ্ছে- ৯৯৯ নম্বরে এমন খবর পেয়ে পুলিশ সেখান থেকে তিন নারী ও এক তরুণকে আটক করে। থানায় নেওয়ার পর আসামিদের হাজতে রাখা হয়। রাত আড়াইটার দিকে এক নারী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ওই নারীকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করার পর ভোর পৌনে ৪টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তবে আসকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুলিশ এই নারীকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ৩টা ৪৮ মিনিটে মৃত অবস্থায় নিয়েছিল, যা হাসপাতালের রেজিস্টারে উল্লিখিত রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে একটি টিকিট নেওয়া হলেও কোনো চিকিৎসা দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের কাছে মৃত কল্পনাসহ আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের এজাহারের কপি, মামলার নম্বর, নিহতকে থানায় আনা এবং থানা থেকে বের করার সময়ের তথ্য চাইলেও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ইয়াসমিন বেগম নামে এক নারীর মৃত্যু হয় গাজীপুর ডিবি পুলিশ হেফাজতে। আসকের তথ্যানুসন্ধান দলের কাছে নিহতের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, ডিবি পুলিশের সদস্যরা ওই নারীকে বাসা থেকে আটক করার সময়ই মারধর শুরু করে এবং মারতে মারতেই তাদের গাড়িতে তোলে। সন্ধ্যা ৭টায় গ্রেপ্তারের পর ডিবি কার্যালয় থেকে রাত সাড়ে ৯টায় তার অসুস্থতার খবর জানানো হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ইয়াসমিন বেগমের সন্তান জিসান গাজীপুর মেডিকেলে গিয়ে তার মাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। মনে পড়ে আরও একজন ইয়াসমিনের কথা। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট পুলিশের সদস্যরা নিজেরা তাদের পিকআপ ভ্যানে তুলে নিয়েছিল নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ইয়াসমিনকে। কিন্তু রক্ষকের ভূমিকায় থাকতে পারেনি সেই পুলিশ সদস্যরা। তারা হয়ে উঠেছিল ধর্ষক ও হন্তারক। পথিমধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল কিশোরী ইয়াসমিনকে। কল্পনা কিংবা ইয়াসমিন শুধু নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা কারা হেফাজতে প্রতিবছরই অনেকে প্রাণ হারান। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কারা হেফাজতে ৪২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই জীবনের অধিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং জীবন রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু কেউ যখন রাষ্ট্রের হেফাজতে বা জিম্মায় থাকা অবস্থায় মারা যায়, সাধারণ দৃষ্টিতেই রাষ্ট্রের ওপর জীবন রক্ষার ব্যর্থতার দায় বর্তায়। নারীর জন্য বাড়তি বিপদ যৌন নির্যাতন ও হয়রানি। পুলিশ হেফাজতে নারীকে যৌন নির্যাতনের এমনকি হত্যার ঘটনাও বিরল নয়। আরও মোক্ষম অস্ত্র 'যৌনকর্মী' হিসেবে পরিচয় দেওয়া। 'বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা'- বহুল প্রচলিত প্রবাদটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সাধারণ মানুষের প্রতি করা ব্যবহারের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলে। যেখানে সাধারণ ধারণাটা এরকম, সেখানে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ খুব একটা হওয়ার কথা না, হয়ও না। সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনে কারও মৃত্যু না ঘটলে বিষয়গুলো খুব একটা জানাজানি হয় না। কেউ অভিযোগ করে না, সুতরাং এসব ঘটনা আলোর মুখও দেখে না। অপরাধ তদন্ত ও তথ্য জানার ক্ষেত্রে আজও পুলিশ মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করে বলে অভিযোগ শোনা যায়। অভিযুক্ত সহকর্মীকে রক্ষায় বিভাগীয়ভাবে চেষ্টা করার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে বলেও শোনা যায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর আইনের অনুশাসন মেনে চলার বিকল্প নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঠপর্যায়ের সদস্যদের জন্য সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষায় বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়।

গবেষক

আরও পড়ুন

×