ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

নারী দিবস

গবেষণা খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ূক

গবেষণা খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ূক
×

বুশরা নিশাত

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২০ | ১৫:০৫

বাংলাদেশে নারী শিক্ষার অভূতপূর্ব প্রসার ঘটলেও পানি, পরিবেশ, জলবায়ু, প্রযুক্তি ও কারিগারি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ কম লক্ষ্য করা যায়। সামগ্রিকভাবে গবেষণা খাতেও একই অবস্থা। ২০ বছর আগে এসব সেক্টরে নারীর সংখ্যা আরও কম ছিল। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে নারীরা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে আগ্রহ দেখান না। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজগুলো অফিসনির্ভর হয়ে থাকে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা বা এ ধরনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অফিস করতে হয়। অফিসের বাইরে খুব বেশি কাজ থাকে না। কিন্তু পানি ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণত অফিসের চেয়ে মাঠপর্যায়ে বেশি কাজ করতে হয়। মাঠপর্যায়ে না গেলে এসব সেক্টরের কাজ শেখা বা জানা সম্ভব হয় না। মাঠপর্যায়ে কাজ করার ক্ষেত্রে নারীদের অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এর সঙ্গে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি বিষয়গুলোতে পড়াশোনার জন্যও নারীদের খুব বেশি উৎসাহ দেওয়া হয় না। তথাকথিত নারীবান্ধব বিষয়গুলোতে তাদের পড়তে উৎসাহ দেওয়া হয়।

পরিবেশ, প্রযুক্তি বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যে নারীরা কাজ করেন, তাদের মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় দুই দিন, তিন দিন, এক সপ্তাহ বা তার চেয়েও বেশি সময় বাসার বাইরে থাকতে হয়। একজনকে পরিবার বা সংসার সামলিয়ে মাঠে গিয়ে কাজ করা কঠিন। চ্যালেঞ্জও বটে। এ জন্য পারিবারিক বা সাংসারিক যে সমর্থন বা সহযোগিতা থাকা দরকার, তা অনেকের থাকে না। ফলে অনেকেই ঝরে পড়ে বা কাজের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। এরপরও যারা সবকিছু সামলে মাঠে যান, তারা আবার নতুন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। দেখা যায়, মাঠপর্যায়ে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় একজন নারী যখন কারও সাক্ষাৎকার নিতে যান বা কথা বলতে শুরু করেন, তখন তার আশপাশে অনেক লোক জড়ো হয়ে যায়। তারা নানা ধরনের মন্তব্য করেন। একজন নারীর জন্য এটা স্বস্তিকর নয়। কিন্তু একজন পুরুষ একই কাজ করলেও তাকে এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় না।

আবার এ ধরনের কাজের সঙ্গে জড়িত থাকেন বিভিন্ন সংস্থা বা অফিসের কর্মকর্তারা। একজন নারী বিশেষ করে অল্প বয়সের একজন নারী তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেন না, কথা বলতে চান না। সেখানেও এক ধরনের অবমূল্যায়নের শিকার হন নারী কর্মীরা। আরেকটি বিষয় হলো- মাঠপর্যায়ে কাজের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে নারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনেক পরিবার মেয়েদের মাঠপর্যায়ে কাজ করতে যেতে দেয় না। মাঠপর্যায়ে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নারী কর্মীরা দুর্ভোগে পড়েন। অনেক সময় যানবাহনের অভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে হয়, বাঁশের সাঁকোতে কিংবা নৌকায় করে নদী পাড়ি দিতে হয়। আবার অনেক এলাকায় ভালো হোটেল পাওয়া যায় না। এমনকি পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট না থাকার ফলে নারীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ফলে অনেক সংস্থা নারী কর্মীদের নিতে চায় না। তবে ক্রমান্বয়ে এসব অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে।

আমাদের দেশে পরিবেশ, গবেষণা, প্রযুক্তি ও কারিগরি সেক্টরে নারীদের বেশি সুযোগ দেওয়া দরকার। কারণ একজন নারী যখন কোনো বিষয়ে চিন্তা করেন- তিনি খুব সামগ্রিকভাবেই চিন্তা করেন, শুধু নিজের কথা চিন্তা করেন না। পৃথিবীজুড়ে প্রযুক্তির অগ্রগতি হয়েছে পুরুষের নেতৃত্বে। কিন্তু সেটা খুব বেশি পরিবেশবান্ধব ছিল না। এ ক্ষেত্রে নারীদের উল্লেখযোগ্য হারে উপস্থিতি থাকলে অবস্থা ভিন্ন হতে পারত। কারণ পরিবেশ ও প্রকৃতির প্রতি নারীদের একধরনের সহজাত আকর্ষণ থাকে। আমরা জানি যে, পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রভাব অনেকাংশে আগে নারীদের ওপর পড়ে। একজন নারী গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে তিনি সমস্যাগুলোর কথা আগেই চিন্তায় রাখবেন। সাধারণ দৃষ্টিতে বিবেচনা করলে দেখা যায়, পরিবারে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাজানো-গোছানো, গাছ লাগানো, গাছের গোড়ায় পানি দেওয়া, অপ্রয়োজনে লাইট-ফ্যান বন্ধ রাখা, পানির অপচয় না করা- এ কাজগুলো মূলত নারীরাই করে থাকেন। অনেক সময় পরিবেশের চিন্তা-ভাবনাগুলো পরিবার থেকে শুরু হয়। যেখানে নারীরাই দায়িত্ব পালন করে থাকেন। এ জন্য পরিবেশ, পানি, জলবায়ু পরিবর্তন, গবেষণাকর্ম ও কারিগারি ক্ষেত্রে সুযোগ পেলে নারীরা অনেক বেশি ইতিবাচক ফলাফল অর্জনে সক্ষম হবেন। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলোও ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। নারীরাও কারিগরি ও প্রকৌশল-প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে অন্য প্রতিবন্ধকতাগুলোও দূর হচ্ছে। এখন নারীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করে এসব সেক্টরে কাজে লাগানো গেলে পরিবেশ ও জলবায়ু  পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জে ইতিবাচক সফলতা বয়ে আনতে পারে বাংলাদেশ।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×