ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

যদি তবে কিন্তু মুক্ত তিস্তা চুক্তি হবে?

যদি তবে কিন্তু মুক্ত তিস্তা চুক্তি হবে?
×

জয়া ফারহানা

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৬

সীমান্তে মানুষ হত্যা, ভারতে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশে অতিরিক্ত শুল্ক্কারোপ, অসম বাণিজ্যসহ আরও অন্তত আধা ডজন সমস্যা রয়েছে, যা বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্ব সম্পর্কে কাঁটা। তবু সব কাঁটা বাদ দিয়ে তিস্তা চুক্তি না হওয়াটাই কেন প্রধান কাঁটা, সেটা প্রশ্ন হতে পারে। সীমান্তে হত্যা সরাসরি দেখা যায়। অসম বাণিজ্যের বিশাল ব্যবধানটি বড়সড় একটি অঙ্ক, অতএব সেটাও দৃশ্যমান। ভারতের সাতবোন রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্যের বিপুল চাহিদা সত্ত্বেও ভারত সরকার বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক্কারোপ করে রেখেছে, সেটাও সবাই দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু তিস্তার জন্য যেভাবে বাংলাদেশিরা পানিতে মরছে, তা দৃশ্যমান নয়। কারণ এ মৃত্যু প্রত্যক্ষ মৃত্যু নয়, পরোক্ষ মৃত্যু। বলা যায়- বারবার মরণ, প্রতি বছর মরণ। গুলি করে মেরে ফেলার চেয়ে থেকে থেকে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলা বেশি নির্মম। ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কষ্টও বেশি। সম্ভবত সে কারণে তিস্তাই প্রধান কাঁটা। 'তিস্তা চুক্তি :টু বি অর নট টু বি' শিরোনামের উপসম্পাদকীয়তে দেখতে পাচ্ছি, তিস্তা থেকে পানি প্রত্যাহার করে মহানন্দা হয়ে ডাহুক নদীতে নিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সেই পানির পরিমাণ কত? কেবল শুকনো মৌসুমেই তিস্তার প্রবাহ থেকে এক হাজার পাঁচশ' কিউসেক পানি মহানন্দায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে বিশ্বের সবচেয়ে কম খরচে সেচ সুবিধা পাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। চীন যেখানে ধান চাষে ২৭০০ ঘনলিটার পানি ব্যবহার করে, পশ্চিমবঙ্গ সেখানে ৫ হাজার ঘনলিটার পানি ব্যবহার করে। পৃথিবীতে ভারতই একমাত্র দেশ, যারা ৮৩ শতাংশ পানি সেচের জন্য ব্যবহার করে। ভারতের সেচ ব্যবস্থা পৃথিবীর বৃহত্তম; কিন্তু হেক্টরপ্রতি উৎপাদন খরচ এখানে অনেক কম।
সেচব্যবস্থার প্রসার ঘটিয়ে খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা ভারতের কৃষিব্যবস্থার দর্শন। সন্দেহ নেই, খুব ভালো দর্শন সেটা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ধান চাষে সেচের পানির এই যে প্রাচুর্য; ওই পানিতে বাংলাদেশেরও ভাগ রয়েছে। পানিকেন্দ্রিক এই আগ্রাসন শুধু পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশে প্রবহমান পানির প্রধান উৎস ব্রহ্মপুত্র। শুকনো মৌসুমেও এর প্রবাহ ৮ হাজার কিউবিক মিটার। সীমানার বাইরে থেকে আসা ৯৯ শতাংশ পানির সিংহভাগ প্রায় ৯০ শতাংশ আসে ব্রহ্মপুত্রের মাধ্যমে। এই নদের উজানে আসামের ডুবুরিতে বাঁধ দিয়েছে ভারত। এখান থেকে ১০৭.১৪২ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রবহমানতার বৈশিষ্ট্যের কারণে উজানের দেশ যদি তার ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ সরিয়ে নেয়, তাহলে তীরবর্তী ভাটির দেশগুলোতে এর প্রভাব পড়ে। ১০ শতাংশ প্রত্যাহার করে নিলেও পড়ে। বাংলাদেশে ধীরে ধীরে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ১৯৯৬ সালের পর থেকে পদ্মা, মহানন্দা, গড়াই, মধুমতির দুই পাড়ের কূপগুলোতে পানির স্তর তিন মিটার নিচে নেমে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির সবচেয়ে খারাপ অবস্থা রাজশাহী, পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনায়। আর্সেনিক তো আছেই। নোনা পানি বেড়ে যাওয়ায় আগামরা রোগে আমাদের সুন্দরবন অংশের সুন্দরী গাছগুলো মরে যাচ্ছে। অথচ যৌথ জলাভূমি ও এর প্রাণবৈচিত্র্য এবং ১৯৭২ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনভেনশনের চুক্তি অনুসারে সুন্দরবনের ক্ষতি না করার দায় ভারতেরও রয়েছে।
অভিন্ন নদীর পানি সরিয়ে নেওয়া, গতি পরিবর্তন বা বণ্টনের একক সিদ্ধান্তের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত বিধি প্রয়োগের কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ নেয়নি। বাংলাদেশের কৃষক বোরো মৌসুমে সেচের জন্য তিস্তার পানি পায় না। সবাই জানেন, কৃষিব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। উচ্চ ফলনশীল ধানের বীজে পানির চাহিদা মাত্রাতিরিক্ত। পানির চাহিদা বেড়েছে অথচ প্রবাহ কমেছে। তিস্তাপাড়ের কৃষকের দশা তবে কী হতে পারে ভাবুন। হেলসিংকি আইনের চতুর্থ ধারাটি তিস্তাপাড়ের কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশ সে পথে হাঁটেনি, কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামেও যায়নি। সম্ভবত বন্ধুত্বের মাধুর্যের ওপর ভরসা রাখতে চেয়েছে। অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থায় প্রতিটি দেশের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে পানির ন্যায্য প্রবাহ যে কোনো দেশের প্রধান অধিকার। বাংলাদেশ তা থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত হয়েছে, নদীর পানির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার তো অনেক দূরের কথা। ভারত মনে করে, অভিন্ন নদীগুলো তার দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পানি সংযোগ ব্যবস্থার অংশ, যা বাংলাদেশের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই এক অববাহিকা থেকে অন্য অববাহিকায় প্রত্যাহার করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশ যে কী মনে করে, তা এখনও বুঝলাম না। আন্তর্জাতিক নদী আইন বলে, নদীর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ যাই হোক প্রত্যেক দেশকে অবশ্যই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। তিস্তার ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক প্রবাহও নেই। বাংলাদেশের তিস্তা বাঁধ এলাকা থেকে শত কিলোমিটার উজানে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত, সেটা তো সবাই জানেন। পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া ও মহানন্দার উজানে দিয়েছে আরও একটি বাঁধ। ভারত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যারা আন্তর্জাতিক নদীগুলোতে একাধিক বাঁধ দেয় এবং যার কোনোটির উচ্চতা ১৫ মিটারের নিচে নয়। বাঁধ, ব্যারাজ, নদনদীর স্বাভাবিক গতি পরিবর্তন করে, বাঁধের জন্য জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়, প্রতিবেশ ও বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়- এটা তো এখন আমরা যারা নদী বিষয়ে অনেক কম জানি, তাদেরও জানা হয়ে গেছে। আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং তীরবর্তী উজানের স্বার্থহানি না করে নদীর প্রবাহ বজায় রাখার মাধ্যমে কূলবর্তী ভাটির দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের নদীনীতি রয়েছে। বাংলাদেশের নদী বিশেষজ্ঞরা নিশ্চয়ই সেসব জানেন। কিন্তু এসব নিয়ে আলাপের জন্য দুই দেশের মধ্যে কোনো কার্যকর ফোরাম আছে? ৫৪টি অভিন্ন নদী নিয়ে ভারতের আশ্বাস ও সিদ্ধান্তের ব্যবধান বহুদিন ধরে দেখছি। কিন্তু এ নিয়ে বাংলাদেশের যে কী সিদ্ধান্ত, তাই বুঝতে পারি না। প্রতীক্ষা, বিশ্বাস ও দীর্ঘশ্বাসেরও একটা মাত্রা থাকে। আর কত?
কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×