নকল পণ্য
সীমিত বৃত্ত থেকে ব্যাপক বিস্তার
আহমদ রফিক
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২০ | ১৩:৪৫
অনেক দিন আগেকার একটি বহুল প্রচলিত রসিকতা- যেখানে নকলের কারখানা, সেখানে লেখা সতর্কবার্তা- 'নকল হইতে সাবধান'। আর পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় একটি প্রশ্ন চেনাজানা বিক্রেতাকে করা হতো অনেকটা সরস ঢংয়ে- 'মালটা খাঁটি তো, নাকি জিঞ্জিরা ব্র্যান্ড'?
অর্থাৎ নকল পণ্যের অসাধুতা আজকের নয়। তবে পার্থক্য হলো, আগে যা ছিল অতিশয় সীমিত বৃত্তে বাঁধা, এখন তার ব্যাপক বিস্তার এবং তা বহুবিধ পণ্যে। নিত্যদিনের ভোগপণ্য থেকে শুরু করে প্রসাধনদ্রব্য, নানারকম ব্যবহার্য বস্তু, এমনকি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ, যা নকলের কারণে জীবনরক্ষার বদলে জীবনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। সম্প্রতি সমকালে প্রকাশিত কয়েক পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে নকলের ছড়াছড়ির যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা এককথায় ভয়ংকর।
নকল পণ্যবিরোধী যে বিশেষ প্রচারাভিযান সমকাল শুরু করেছে তা নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। সংবাদমাধ্যমের এ ধরনের উদ্যোগের সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব আশা করা যায়। জনজীবনের নানা বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীল এমন ভূমিকা অবশ্যই প্রশাংসার দাবি রাখে। সমকালের এই উদ্যোগের সঙ্গে সচেতন সবার সম্পৃক্ততা এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পারে। 'নকল পণ্য কিনবো না, নকল পণ্য বেচবো না'- এ শিরোনামে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমকালের এই উদ্যোগের সঙ্গে চাই সম্মিলিত প্রতিরোধ কার্যক্রম। সবার দৃঢ় অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি-আন্তরিকতা আমাদের নকলের বৃত্তমুক্ত করতে পারে।
শেষোক্ত বিষয়টি নিয়ে বলতে হয় :কী ভয়ংকর ব্যবসায়ী নামক মানুষের মনুষ্যত্ববোধ! অবৈধ পথে অর্থ সংগ্রহের লোভে মানুষের মৃত্যু ঘটাতে বিবেকে বাধে না, কোনো তাড়না অনুভূত হয় না কিছু সংখ্যক মানুষ নামক জীবের। একালে সামাজিক মূল্যবোধে ক্ষয় বা দূষণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নকল সর্ববিস্তারী রূপ ধারণ করেছে।
সমকালের অনুসন্ধানী ধারাবাহিক প্রতিবেদনে নকল ও অবৈধ পণ্যের ক্ষেত্রে প্রধান যে পাঁচটি পণ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- প্রসাধনী, ওষুধ, মোবাইল ফোন হ্যান্ডসেট, সিগারেট এবং সরকারি রেভিনিউ স্ট্যাম্প। খাদ্যপণ্য নিয়ে আলাদা সিরিজ প্রতিবেদন করার কথাও জানিয়েছে সমকাল। প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে গবেষণাগারে কিংবা ল্যাবে পরীক্ষা ছাড়াই ক্ষতিকারক উপাদানের সংমিশ্রণে উৎপাদিত নকল পণ্য কীভাবে বাজারে চলে আসছে। এসব পণ্য জনস্বাস্থ্য তো বটেই, হুমকির মুখে ফেলেছে পরিবেশও। ক্ষতি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্বের, নৈতিকতার ধস বড় ভয়ংকর। একবার নৈতিকতায় ধস নেমে এলে এর বিরূপ প্রভাব হয়ে দাঁড়ায় বহুমুখী।
ট্যাক্স স্ট্যাম্পও নকল করে অবৈধ বাণিজ্যের খবর মিলেছে সমকালের ওই ধারাবাহিক প্রতিবেদনেই। ক্রেতা বৈধ পণ্য কেনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া মানেই ভোক্তার অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়া। নকল ওষুধ ও প্রসাধনী স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও প্রকট করে তোলে। বিএসটিআই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, নিরাপদ ও বিশেষ খাদ্য আইনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। মাঝেমধ্যে নকল পণ্যবিরোধী অভিযান দৃশ্যমান হলেও অসাধু ব্যবসায়ীরা থেমে নেই। বিএসটিআই, র্যাব, ক্যাব, এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার, জেসিআই-নর্থ এই সংস্থা কিংবা সংগঠনগুলো সমকালের উদ্যোগে সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয়েছে। চ্যানেল ২৪, ঢাকা এফএম রেডিও যুক্ত হয়েছে। আমরা আশান্বিত সবার প্রচেষ্টায় আমরা নকল পণ্য মুক্ত হতে পারব। তবে নকল সার্বিক তথ্য দিতে গেলে শেষ কথা বলার আগেই পাতা শেষ হয়ে যাবে। তবু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কথা না বললে, তথ্য না দিলে নয়।
একটি মার্কিনি 'ফোক মেডিসিনে'র বইতে (চিকিৎসকের লেখা) পড়েছিলাম আপেল জুস-আপেল সিডার ভিনিগার ও বিশুদ্ধ মধুর আশ্চর্য গুণাবলির কথা, ওই চিকিৎসকের অভিজ্ঞতার বয়ান। প্রাচীন ভারতে ও প্রাচীন ইরানি চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও মধু ও শাক-সবজির ভেষজগুণের কথা সবিস্তার বলা হয়েছে। যেমন রোগ নিরাময়ে, তেমনি রোগ প্রতিরোধে।
কিন্তু কোথায় মিলবে বিশুদ্ধ মধু? যদি সুন্দরবন থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংগ্রহ করা যায়, তাহলে এক কথা। তা না হলে মধুর বদলে চিনির রসে মধুর স্বাদ ও কার্যকারিতা মেটাতে হবে। কারণ সমাজটা যে ভয়ানক রকম বদলে গেছে সততা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে।
তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে হয়, স্বাধীনতার পরপরই সরষে ফলনে ঘাটতির কারণে দেখা গেল, সরষের তেলে একই রকম রঙের মবিল তেলের ভেজাল মেশাতে। মবিল তখন সস্তা সরষের তেলের চেয়ে। কী ভয়ানক কাণ্ড! সেই থেকে সরষে তেলে ইতি। ঘটনাটি এত ছড়িয়ে ছিল যে, সরষে তেলের স্থান দখল করে নিল আমদানি করা সয়াবিন তেল। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে, দেশজুড়ে সয়াবিনের একচেটিয়া ব্যবহার। বলতে হয়- 'হায় সরষে, তোমার দিন ফুরালো'।
দুই.
বলছিলাম সমাজটার দুশমনি দিকবদলের কথা। নিত্যপণ্য থেকে সব রকমের ভোগপণ্য, এমনকি দুধ, স্থানিক বা অস্থানিক প্রসাধন সামগ্রী কসমেটিকস থেকে ওষুধ- সর্বত্র থাবা বিস্তার করে আছে, নকলের আগ্রাসন; আক্রমণ শব্দটাই বোধহয় এ ক্ষেত্রে সঠিক বিবেচিত হবে। তাই সমকালে মোটা হরফে প্রথম পাতার খবর- শিরোনাম : 'নকল পণ্যের ভিড়ে আসল চেনা দায়'। ছোট হরফে লেখা : 'বড় অঙ্কের রাজস্ব ক্ষতি বাড়ছে, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি'।
আবারও বলছি, এ ঘটনা আজকের নয় এবং দু-চারটে পণ্য নিয়ে নয়। উল্লিখিত প্রতিবেদনে অনেক পণ্যের কথা বলা হয়েছে। নকলের প্রসঙ্গে বহু নামিদামি বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের কথা বলা হয়েছে, যেগুলোর নিখুঁত নকল বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এ কাজে আমাদের নকলনবিশদের দক্ষতা তুলনারহিত। স্বভাবতই প্রশ্ন মনে উঠতে পারে- এই মেধা ও দক্ষতা কি সৎকর্মে লাগানো যায় না, তাহলে দেশ ও জাতির কিছু প্রাপ্তিযোগ ঘটত।
দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের, এই লোক-ঠকানো ও সরকার-ঠকানো বিদ্যায় কিছু মানুষ কী পরিমাণ দক্ষ এবং পারদর্শীই না হয়ে উঠেছে। হায় পুরান ঢাকা, তোমার মেধা ব্যবহূত হচ্ছে মানুষ-ঠকানো অসাধু ব্যবসার কুখ্যাতি অর্জনে, ক্ষেত্রবিশেষে তা মানবদেহের অপূরণীয় ক্ষতিসাধনে। পুরান ঢাকার অনুকরণে-অনুসরণে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নকল পণ্য তৈরির অবৈধ কারখানা গড়ে উঠছে।
প্রতিবেদনে নকল পণ্য তৈরির যে তালিকাটি সরবরাহ করা হয়েছে তা বেশ বড়সড়ই বলতে হবে। যেসব বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য খুবই জনপ্রিয়, সেগুলোর দিকেই নকলনবিশদের ঝোঁক বেশি। কারণ তাতে আয় বেশি। কী করবেন অসহায় ক্রেতা? কীভাবে শনাক্ত করবেন আসলকে নকল থেকে। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় খুচরো বিক্রেতাদের যোগসাজশ ও অসাধু ভূমিকা থাকে।
নকল শিল্পপণ্যে ক্রেতার ক্ষতি আর্থিক দিক থেকে, পণ্যটির স্বল্প পরমায়ুর কারণে। কিন্তু প্রসাধনীর ক্ষেত্রে দুঃসংবাদ নারীকুল, বিশেষ করে সুন্দরীদের জন্য, যারা ভয়ানক রকম প্রসাধনপ্রেমী, তারা কী করে জানবেন ওই প্রসাধনীতে এমন সব রাসায়নিক থাকতে পারে, যা তাদের ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ানো দূরে থাক, বরং তার ক্ষতিই করবে।
দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ড মিলে জনবহুল বাংলাদেশের কি রাজধানীতে, কি শহরগুলোতে প্রসাধনীর বিশাল বাজার। এমনকি গ্রামীণ তরুণীরাও এদিক থেকে পিছিয়ে নেই, বিশেষ করে কসমেটিকসের ক্ষেত্রে। কেনইবা থাকবে? সমঅধিকার বলে কথা। তার প্রমাণ মেলে রাজধানীর পোশাক শিল্পকারখানার নারী শ্রমিক, বিশেষত তরুণী-শ্রমিকদের ক্ষেত্রে।
তাই এমন সুবর্ণ সুযোগ নকলনবিশরা ছাড়বে কেন? এত বড় বাজারের কিছু মুনাফা তো লুটতেই হবে। 'কিছু' নয়, বেশ কিছু। অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কল্যাণে বিশাল এক দুর্নীতির গোপন চালচিত্র বের হয়ে আসছে। এতে সংশ্নিষ্ট একাধিক ধারার মানুষ। উদ্দেশ্য একটাই- অধিক লাভ, অধিক মুনাফা। নকলের এই থাবা থেকে রক্ষা পেতে অত্যন্ত সময়োপযোগী উদ্যোগ নিয়েছে সমকাল। এ ক্ষেত্রে সচেতন সবার সহযোগিতার হাত প্রসারিত হলে আশানুরূপ সুফল মিলতে পারে।
প্রতিবেদনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও বিনষ্ট মূল্যবোধেরও প্রতিফলন বটে। এতে বলা হয়েছে, 'ঢাকার কয়েকটি মার্কেটের বিক্রয়কর্মীরা... নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেশিরভাগ নকল পণ্য চকবাজার ও মৌলভীবাজার থেকে আসে। আসল কোম্পানির পণ্যে লাভ কম হওয়ায় মালিকের নির্দেশে তারা এ অপরাধ করছেন।... আলাদা করে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা নেই ক্রেতাদের। তাদের মতে, দেশি ও বিদেশি সব ধরনের প্রসাধনী নকল হয়। বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য বেশি নকল হয়।
তিন.
বাংলাদেশের সমাজচরিত্র কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে, তার সর্বনাশা রূপের ছোট একটি চালচিত্র সমকালের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে। দুর্নীতির সর্বনাশা চিত্র, তবে তা সর্বাত্মকরূপে প্রতিফলিত। শিরোনামটি জুতসই- 'ফুটপাত থেকে শপিংমল'। এ দুর্নীতির আঘাত থেকে পোশাক-শ্রমিক তরুণী বা বিত্তবান পরিবারের নারী কারও রেহাই নেই। কারণ নামি শপিং সেন্টার যে এ সর্বগ্রাসী দুর্নীতির আক্রমণ থেকে মুক্ত, এ কথা জোর দিয়ে বলার উপায় নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, 'নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করা ঠেকানো না গেলে একদিকে দেশের অর্থনীতিকে আরও ক্ষতির মুখে ফেলবে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়বে। তাই এ ব্যাপারে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি করা না গেলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন। অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আহরণে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব।' অর্থাৎ ক্ষতি একমুখী নয়, প্রকৃতপক্ষে ত্রিমুখী- ভোক্তা, সৎবিক্রেতা বা ব্যবসায়ী এবং সরকারের রাজস্ব বিভাগ।
বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সেগুলোর মোকাবিলা কঠিন হলেও রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর তৎপরতা আরও বাড়াতে হবে, ব্যাপক করতে হবে অভিযানের লাগাতার ভূমিকা- না হলে পরিণামে সমূহ বিপদ।
ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক
