‘চোখের সামনত চলি গেল বাপ-দাদার বসতভিটা, মুই খালি চাইয়া দেখনু’
টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ছবি: সমকাল
এ মান্নান আকন্দ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ১৯:২০
‘চোখের সামনত পলকের মধ্যে চলি গেল বাপ-দাদার বসতভিটা। মুই কিছুই করবার পানু না, খালি চাইয়া চাইয়া দেখনু। সারারাত ঘুম জাগি, ঘরের মালছামানা ও চালের টিন খুলি নিছম। তা না হলে ঘর সমেত নদীত চলি গেল হয়। সিমেন্টের খুঁটিগুলা সরবার লোক পাম নাই। এখন আর ক্যাইও আইসে না। ভোট আইলে কত কথা কয়। হ্যামরা কারও দোষ দেই না। সগ হ্যামর কপালের দোষ।’
কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরের বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী মো. ফরমান আলী। সোমবার তিস্তার তীব্র ভাঙনে মুহূর্তের মধ্যে বাপ-দাদার বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান তিনি।
ফরমান আলী বলেন, এর আগেও পাঁচবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তারা। তিস্তার চরে এই ভিটাটিই ছিল বাপ-দাদার শেষ স্মৃতি। বর্ষা এলেই চরবাসীর জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ দেখেননি তারা।
মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে সুন্দরগঞ্জে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের মুখে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চরাঞ্চলের মানুষ। পানি বাড়তে থাকায় তিস্তার চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে কোনো সরকারি কর্মকর্তা যাননি।

স্থানীয়রা জানায়, গত এক সপ্তাহে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের উজান বোচাগাড়ি, ভোরের পাখি চরসহ বিভিন্ন এলাকায় দুই শতাধিক বসতভিটা, পাঁচ শতাধিক একর ফসলি জমি এবং রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও হাজারো বসতভিটা, শত শত একর কৃষিজমি, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
সবচেয়ে বেশি ভাঙন দেখা দিয়েছে কাপাসিয়া, হরিপুর, বেলকা, চণ্ডীপুর ও শ্রীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। জিওব্যাগ ফেলার কাজও আপাতত বন্ধ রয়েছে।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রফিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙনের মুখ থেকে ঘরবাড়ি সরাতে গিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চরবাসী। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে আসেননি। তিনি স্থায়ীভাবে নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জু মিয়া বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ইউনিয়নের লালচামার, ফুলমিয়ার মোড়, উজান ও ভাটি বোচাগাড়ি এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন চলছে। নিমেষেই বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও রাস্তাঘাট নদীগর্ভে চলে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দুর্ভোগের শেষ নেই।

কানিচরিতাবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও বিএনপির সাবেক উপজেলা সভাপতি মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, নদী খনন, ড্রেজিং, নদীশাসন ও সংরক্ষণের বিকল্প নেই। শুধু জিওটিউব বা জিওব্যাগ দিয়ে তিস্তার ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। স্থায়ী সমাধান না হলে একসময় উপজেলার মানচিত্রই বদলে যেতে পারে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান বলেন, কাপাসিয়া ও হরিপুর ইউনিয়নের কয়েকটি চরে ভাঙনের খবর পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সহায়তা দেওয়া হবে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে নদীতে পানি বাড়ায় ভাঙন কিছুটা কমেছে। ভাঙন দেখা দিলে জিওটিউব ও জিওব্যাগ ফেলার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। তবে নদী খনন, ড্রেজিং ও নদীশাসনের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া তিস্তার ভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা সম্ভব নয়।
এদিকে উজানের ঢল ও টানা বর্ষণে তিস্তার চরাঞ্চলের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। তবে পানি বাড়লেও সুন্দরগঞ্জ অংশে তিস্তার পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
