ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

সমাজ

সকলে আমরা নিজের তরে

সকলে আমরা নিজের তরে
×

এম আর খায়রুল উমাম

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২০ | ১৩:১৯

একটি কবিতার পঙ্‌ক্তি মনে পড়ছে। 'পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/এ জীবন মন সকলি দাও/তার মত সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।/পরের কারণে মরণেও সুখ/'সুখ-সুখ' করি কেঁদো না আর/ যতই কাঁদিবে যতই ভাবিবে/ ততই বাড়িবে হৃদয় ভার/আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে/ আসে নাই কেহ অবণী পরে/সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।'
আমাদের ছেলেবেলায় কবি কামিনী রায়ের এই নীতি কবিতাটি পড়েনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ছোটবেলায় পড়া নীতি-উপদেশমূলক গল্প বা কবিতা থেকে নেওয়া শিক্ষা ব্যক্তিজীবনে চলার পথে বিশেষ মূল্য সৃষ্টিতে সহায়ক ছিল। আজও তা সমভাবে ভূমিকা রাখতে সম্ভব। কিন্তু সম্ভব হলেই যে মূল্যায়িত হবে, এমন কোনো কথা নেই। স্বাধীন বাংলাদেশ তার ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রজীবন থেকে নীতি-উপদেশমূলক গল্প-কবিতাগুলোকে হারিয়ে ফেলেছে। এখন আর কোথাও নীতিকথা পড়তে হয় না, মানার তো কোনো প্রশ্নই আসে না। খুব আক্ষেপের সঙ্গে উচ্চস্বরে সর্বত্র আলোচিত হতে শোনা যায় নীতি-নৈতিকতার কথা; কিন্তু বাণী প্রচারকারীদের জীবনাচারে তার লেশমাত্র দেখা যায় না। প্রাপ্তিযোগের প্রত্যাশায় মরিয়া হয়ে ছুটছেন অনেকেই। সীমাহীন প্রাপ্তিও এদের সন্তুষ্ট করতে পারছে না। একজনের প্রাপ্তি অন্যদের উৎসাহিত করছে। প্রাপ্তির প্রতিযোগিতায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হানাহানি-মারামারি করে আধিপত্য বিস্তারের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। মসনদের মোহে ব্যক্তির প্রাপ্তিযোগে সহযোগিতার হাত ক্রমশ শক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রাপ্তিযোগের অধিকার পাওয়া মানে জুলুম আর শোষণ করার অধিকারী হওয়া। কে, কীভাবে এই দুই কাজ করবে, তা বলা কঠিন। কারণ সবার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এক হলেও কর্মপন্থায় ভিন্নতা দেখা যায়। পরিবেশ-পরিস্থিতি, পদ-পদবি, অবস্থান বিবেচনায় এ ভিন্নতা সৃষ্টি হয়। প্রাপ্তির কোনো সীমারেখা না থাকায় থামার কোনো প্রচেষ্টাও নেই। রকেটগতিতে প্রাপ্তিযোগ চলমান। প্রাপ্তিযোগ তিলের মধ্যে থাকছে না, সব তাল হয়ে যাচ্ছে। নিজের জন্য তাল নিশ্চিত করতে সর্বত্র প্রতিযোগিতা চলমান। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জীবনের সবকিছু অর্জন বিসর্জন দিয়ে প্রাপ্তিযোগের অংশ হতে পতঙ্গের মতো আলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। স্বাধীন বাংলাদেশ স্বাধীনভাবেই জোর কদমে এগিয়ে চলেছে। শুধু প্রাপ্তিযোগের একটা সুযোগ চাই। সুযোগ প্রদানকারী প্রধান পৃষ্ঠপোষককে সন্তুষ্ট করে একবার সুযোগ পাওয়া গেলে আগামী কয়েক পুরুষের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে যায়। ভবিষ্যতের কোনো অন্ধকারের শঙ্কা গ্রাস করতে পারে না। তখন শুধুই এগিয়ে চলা।
বাংলাদেশে ক্যাডার সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারদের অবস্থা বহুলাংশে দেশের কারেন্সি নোটে লেখা 'চাহিবা মাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে'-এর মতো। পদ-পদবি, ক্ষমতা যখন যা প্রয়োজন চাহিবা মাত্র সরকার প্রদান করে চলেছে। সারাদেশে যেখানে পদোন্নতির আকাল চলমান, সেখানে প্রশাসনের পদগুলোতে দ্বিগুণ, তিনগুণ পদোন্নতি দেওয়া হয়ে থাকে। দেশে যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ হয়ে থাকে, তার সিংহভাগই এখানে হয়। উচ্চতর পদসহ যে কোনো পদ চাহিবা মাত্র পাওয়া যায়। সাংবিধানিক সংজ্ঞা মোতাবেক 'প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী' হলেও অন্য সব ক্যাডারের মতো এই ক্যাডারদেরও সবাই 'কর্মকর্তা' হিসেবে উপস্থাপিত হয়ে থাকেন। তারা নিজেদের ছাড়া অন্য সবাইকে অধীন বিবেচনায় প্রজাতন্ত্রের মালিকদের প্রজা বানিয়ে রেখে রাজার প্রতিনিধিত্ব করেন। কাজেকর্মে, ব্যবহারে সবসময় তা প্রকাশিত। মানুষের কল্যাণ ও মর্যাদার চেতনাবোধের সঙ্গে শ্রদ্ধাবোধই সেবার প্রথম শর্ত। মানুষকে ভালো না বাসলে সেবা করা যায় না। মানবপ্রেমের মন বিশেষ সাংস্কৃতিক স্তরে উন্নীত করা না গেলে মুক্তি আসবে না। বাংলাদেশের পেশাজীবীদের অনেকেই নিজ প্রাপ্তিযোগ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে বিষয়টিকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত করে নিয়েছেন। সামান্য সুযোগে তা বীভৎসরূপে আত্মপ্রকাশ করছে। নিজ স্বার্থ কোন্দলে দ্বিধাহীন তারা। দেশ ও জাতির স্বার্থে নিজেদের সহিষুষ্ণ ও সংযত রেখে পেশার অন্যদের সঙ্গে আপস করতে পারছেন না। ফলে পেশার অনগ্রগতিই শুধু নয়, দেশ ও জাতি স্বস্তিতে নেই।
দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়েও বাংলাদেশে পদপ্রাপ্তির প্রধান যোগ্যতা রাজনৈতিক মতাদর্শ। ব্যক্তির রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকবে, তা স্বাভাবিক। কিন্তু পদপ্রাপ্তিতে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রধান নিয়ামক হলে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে প্রধানের দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা। এমনিতে দেশে সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহি, দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতার অভাব দিনের আলোর মতোই পরিস্কার বলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে। বাঁধা আইনের মধ্যে থাকা সরকারি কর্মচারীদের যেখানে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে দীর্ঘ চাকরি জীবন শেষে পাওনা বুঝে নেওয়া বাঁধনহীন অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা নিয়ন্ত্রণহীন হবেন, এটাই স্বাভাবিক। প্রাপ্তির সর্বোচ্চ সম্মানও এদের দেশপ্রেম ও মানবপ্রেমের প্রমাণ দিতে ব্যর্থ। শুধু তাই নয়, পুরো সিস্টেমের কর্মদক্ষতা এভাবে নষ্ট করা হচ্ছে। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের জন্য বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার সংক্রান্ত ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা স্বমহিমায় চলমান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যে কোনো সময় যে কোনো নাগরিককে গ্রেপ্তার করতে পারে। সরকার, সরকারি মহল, প্রভাবশালী ভিভিআইপি, ভিআইপিদের সঙ্গে ব্যক্তিস্বার্থ যোগ হয়ে এই ধারার ব্যবহার হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে অনেক ভুক্তভোগী মানুষ বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের ফৌজদারি ধারাটি বাতিলের দাবি জানালেও কোনো সুফল হয়নি। এমনকি আদালত ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের সুপারিশ করলেও তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ দেখা যায়নি। অথচ প্রজাতন্ত্রের মালিকদের জন্য এমন ধারা বলবৎ থাকলেও সরকারি কোনো কর্মচারী ফৌজদারি অপরাধ করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে পারবে না। গ্রেপ্তারের আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশকে একটা আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম পদক্ষেপ ১৯৭২ সালে আমাদের জন্য আদর্শ ও শ্রেষ্ঠ সংবিধান রচনা। সংবিধানের বাস্তব প্রয়োগ ও অনুসরণে শুরুতেই বাধা আসে। এরপর শুরু হয় সংবিধান বানচালের প্রতিযোগিতা। সংবিধানের মাথায় বিসমিল্লাহ বসিয়ে বাঙালি জাতীয়তা, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। আর রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম সংবিধানের স্থান করে নেওয়ায় দেশের সব নাগরিক সমানে অঙ্গীকারের ব্যত্যয় ঘটানো হয়। ফলে সব নাগরিক সুবিচার পাওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের ভূমিধস বিজয়েও সংবিধান তার ঐতিহ্য ফিরে পেল না। বরং ধর্ম, ভাষা, যোগ্যতার পার্থক্য তৈরি করে কাড়াকাড়ি-মারামারি লাগামহীন করা হলো, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে প্রভাব পড়ায় সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি স্বপ্নের মধ্যেই রয়ে গেল।
আমাদের ক্ষমতাপ্রিয় অনেক জনপ্রতিনিধিই শাসক হতে যতটা আনন্দ অনুভব করে থাকেন, তার এক শতাংশও সেবক হয়ে সুখ পান না বরং সেবক হতে লজ্জাবোধ করেন। অনেকেই প্রতিবাদী কণ্ঠ সহ্য করতে পারেন না। মোসাহেবি পছন্দ করেন, কামনা করেন। প্রাপ্তিযোগ নিশ্চিত করার আগে পূর্বাপর বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ বহুজনের কল্যাণের মধ্যে নিজের কল্যাণ- এই আপ্তবাক্যটা হারিয়ে যেতে বসেছে দেশ থেকে। তাই দেশ ও জাতির স্বার্থে কামিনী রায়ের বিখ্যাত কবিতাটি আমাদের প্রাত্যহিক অনুসরণীয় হোক- এই প্রত্যাশা।
সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[email protected]

আরও পড়ুন

×