করোনা সংকটের সামাজিক-সাংস্কৃতিক দৃশ্যপট
সাদেকা হালিম ও মাজহার মোশাররফ
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২০ | ১৪:১৮
'দেখেছি আমারি হাতে হয়তো নিহত/ ভাই বোন বন্ধু পরিজন পড়ে আছে;/ পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;/ মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।' (সুচেতনা, জীবনানন্দ দাশ)
কবি জীবনানন্দ দাশের এই অনুপম কবিতাখানি মানব ইতিহাসে আর কখনও এত প্রাসঙ্গিক হয়েছিল কিনা, আমাদের জানা নেই।
বিগত ১১ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন কভিড-১৯ সংক্রমণকে 'প্যানডেমিক' ঘোষণা করল, তখনও বোধ করি বিশ্ববাসী ধারণা করতে পারেনি যে, এই ভাইরাসটি ১৯৯ দেশের প্রায় ৭ লাখ মানুষকে আক্রমণ করবে আর প্রায় ৩১ হাজার মানুষকে মৃত্যুর দুয়ারে পাঠিয়ে দেবে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা :২৯ মার্চ ২০২০)।
বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবে ৪৯ জন করোনা পজিটিভ শনাক্ত ও পাঁচজনের মৃত্যু হলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ঠিকমতো প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা না নিলে এখানেও তা ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করবে। উদ্ভূূত পরিস্থিতিতে সরকার নাগরিকদের বাড়িতে অবস্থানের জন্য গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করলে আমরা দেখতে পেলাম, শুধু ঢাকা শহর থেকেই প্রায় সোয়া কোটি মানুষ ট্রেন, বাস ও লঞ্চে গাদাগাদি করে গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বাংলাদেশ সরকার সব নাগরিককে বাড়িতে অবস্থান ও আন্তঃব্যক্তিক অনূ্যন ৩ ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে বলেছে। ফ্যাক্টরিগুলো তখনও খোলা ছিল এবং তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক তখনও কারখানায় কাজ করছিল। ২৮ মার্চ যখন কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়, ততদিনে গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব শ্রমিক শহরের বিভিন্ন বস্তিতে আটকা পড়ে যায়। বিশেষ করে ঢাকার মতো সবচেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ একটি শহরে সেখানে সামাজিক ও দৈহিক বিচ্ছিন্নতা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব। ফলে একবার সংক্রমণ শুরু হলে তা এক নিদারুণ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনার আশঙ্কা তৈরি করবে।
লক্ষণীয়, করোনা আতঙ্ক শুরু হওয়ার পর থেকে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বাড়িতে মজুদ করেছে, যাকে বলা হয় 'প্যানিক বাইং'। এদিকে গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সাপ্লাই চেইন প্রায় ভেঙে পড়ায় প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেছে। ফলে এই দুর্যোগের মধ্যে স্বল্প ও মাঝারি আয়ের লোকজনের জীবনে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৭০ লাখের অধিক শনাক্ত এবং একই সংখ্যক অশনাক্ত ডায়াবেটিক রোগী আছেন, যাদের প্রধান চিকিৎসাই হলো সকাল-বিকেল নিয়ম করে হাঁটা। অঘোষিত লকডাউনের কারণে তারা কেউ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। ফলে করোনা তো আছেই; অন্য এক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
করোনা সংক্রমণ রোধে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে আছে। সরকারি উদ্যোগে টেলিভিশনের মাধ্যমে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির কিছু ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও তা কীভাবে এবং কী সংখ্যক শিক্ষার্থী গ্রহণ করতে পারবে, তা এক বিরাট প্রশ্ন। কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাস চালু করলেও দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। এ অবস্থা প্রলম্বিত হলে দেশে এক শিক্ষা সংকট দেখা দেবে।
ক্ষুদ্র আয়ের লোকজন, দিনমজুর, শ্রমজীবী মানুষ, পরিবহন শ্রমিক, ফল বিক্রেতা, সবজি বিক্রেতা, মাছ বিক্রেতা, চা শ্রমিক, প্রান্তিক মানুষ বিরাট চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, এরা নিজেদের ভিক্ষুক মনে করে না। ফলে বেশি দিন দান কিংবা ঋণ তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাদের জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা কর্মপরিকল্পনা।
লকডাউন বা আইসোলেশনের কারণে পারিবারিক সম্পর্কেও এক নতুন মাত্রা সূচিত হচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী দু'জনকেই টানা ঘরে থাকার কারণে পারিবারিক জীবনে এক নতুন অভিজ্ঞতার জন্ম হচ্ছে। গতানুগতিক ব্যস্ত নাগরিক জীবনে ঘর হয়ে উঠেছিল দিনের শেষে একটু বিশ্রাম আর ঘুমোবার জায়গা। এখন পরিবারের সদস্য সবাই বাড়িতে অবস্থান করার কারণে এবং গৃহকর্মীরা অনুপস্থিত থাকায় পরিবারের শ্রম বিভাজনে, স্বামী-স্ত্রী-সন্তান সবার অংশগ্রহণে এক নতুন পারিবারিক গতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যা করোনা-পরবর্তী সময়েও আমাদের নতুন এক গৃহব্যবস্থাপনা সংস্কৃতির জন্ম দিতে পারে।
লেখকদ্বয় যথাক্রমে অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ও ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- করোনা সংকট
- সাদেকা হালিম
- মাজহার মোশাররফ
