ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

পেনাল্টি বিতর্কে সেনেগালের কান্না

পেনাল্টি বিতর্কে সেনেগালের কান্না
×

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৯

সেনেগালের ডাগআউটে তখন সুনসান নীরবতা। প্রতিবাদের ভাষাটুকুও অবশিষ্ট নেই। খেলোয়াড়দের চোখ-মুখে বিষণ্নতায় ফুটে ওঠে সদ্য উদ্বাস্তু হওয়া একটি দলের প্রতিচ্ছবি। ফুটবল বিশ্বকাপ ভূখণ্ড থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে ভিএআর প্রযুক্তির অপপ্রয়োগে! শেষ ষোলোয় উন্নীত হওয়ার ম্যাচে তেরেঙ্গার সিংহদের খাঁচায় বন্দি করে এক বিতর্কিত পেনাল্টি। সারাক্ষণ লড়াই করে শেষ মুহূর্তে প্রযুক্তির বাড়াবাড়িতে স্বপ্নভঙ্গ হওয়া খুবই কষ্টের। সেই কষ্ট সেনেগালের খেলোয়াড়দের। বিশ্বকাপে পক্ষপাতিত্বের সন্দেহ জোরালো করে রেফারি ভিএআর দেখে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করায়। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষককে ফাউলের অজুহাত দেখিয়ে জার্মানির গোল বাতিল করা আর বৃহস্পতিবার ভোরে সেনেগালকে ভিএআরের বিষাক্ত ছোবলে প্রশ্নবিদ্ধ করে প্রযুক্তির ওপর অতিনির্ভরতা। উত্তেজনা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিতর্কের ম্যাচ ৩-২ গোলে হেরে ৩২-এ শেষ হয় সেনেগালের বিশ্বকাপ। হেরে যাওয়া ম্যাচ শেষের রোমাঞ্চে জিতে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নেওয়া বেলজিয়াম-রূপকথা।

সেরা ৩২ রাউন্ডে টাইব্রেকারে হেরে জার্মানি, নেদারল্যান্ডসের বিদায় একটু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্বকাপের উন্মাদনা। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর তিনবারের ফাইনালিস্টদের বিশ্বজোড়া সমর্থন। বেলজিয়াম সে তুলনায় পেছনের সারিতে। এরপরও ইউরোপীয় হিসেবে ম্যাচের ফেভারিট ছিল বেলজিয়াম। সেই দলের বিপক্ষে গর্ব করার মতো ফুটবল খেলেছে সেনেগাল। তারা দুই অর্ধে দুটি গোল করে লিড ধরে রাখে ৮৫ মিনিট। ইংল্যান্ডের ক্লাব সান্ডারল্যান্ডের সেন্টার মিডফিল্ডার হাবিব দিয়ারা ২৪ মিনিটে আর ক্রিস্টাল প্যালেসের স্ট্রাইকার ইসমাইলা সার ৫১ মিনিটে করেন গোল। প্রথম গোলটি তুলনামূলক সহজ হলেও দ্বিতীয় গোলটি ছিল দেখার মতো। পেছন থেকে ভেসে আসা বল বুকে রিসিভ করে মাটি ছোঁয়ার আগেই জালে জড়ান সার। এই গোল ব্যবধান (২-০) বেলজিয়াম কমাতে পারবে না বলেই মনে করা হচ্ছিল। সে অনিশ্চয়তা উড়িয়ে দিয়ে ৮৬ ও ৮৯ মিনিটে দুটি গোল করে ম্যাচে সমতা প্রতিষ্ঠা করে বেলজিয়াম।

পিছিয়ে থাকা দলের ভাগ্যের চাকা ঘোরান ৪৬ মিনিটে বদলি নামা ফরোয়ার্ড লুকাকু। তিনিই করেন ৮৬ মিনিটের গোলটি। তিন মিনিটের ব্যবধানে হেডে গোল করে বেলজিয়ামের লাইফলাইনে অক্সিজেন সরবরাহ করেন অধিনায়ক ইউরি টিয়েলেমানস। শেষের রোমাঞ্চে খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। এই ৩০ মিনিটেও লড়াকু ছিল সেনেগাল। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল দর্শক হয়তো ভেবে নিয়েছিল, পেনাল্টি শুটআউটেই শেষ হবে ম্যাচ। ১২০ মিনিট খেলা হয়ে গেলে মস্তিষ্কে এই ভাবনা ভিড় করা স্বাভাবিক। কিন্তু ফুটবল-ঈশ্বর যে লিখে রেখেছেন অন্য স্ক্রিপ্ট। অতিরিক্ত সময়ের (১২১ মিনিট) একেবারে শেষ দিকে বক্সের ভেতরে ক্রস থেকে ভেসে আসা বলে নিয়ন্ত্রণ পেতে পা বাড়ান বেলজিয়ামের অধিনায়ক ইউরি টিয়েলেমানস। সেনেগালের ডিফেন্ডার লামিন কামারা চেষ্টা করেন বল বের করে দেওয়ার। সেই মুহূর্তে তাঁর পা পেছন থেকে টিয়েলেমানসের পায়ে লাগে। বেলজিয়াম অধিনায়ক পড়ে গেলে জোরালোভাবে চাওয়া হয় পেনাল্টি। রেফারি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন।

পরে ভিএআর প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ফাউল দ্বিতীয়বার পর্যবেক্ষণ করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। সেনেগালের খেলোয়াড়রা রেফারিকে বোঝানো, রিপ্লে জোন ঘিরে রাখা এবং পেনাল্টি স্পটে গিয়ে বসে পড়ে শালীনভাবে প্রতিবাদ জানান। যদিও এই প্রতিবাদের কোনো কিছু আমলে নেওয়া হয়নি। বেলজিয়ামের অধিনায়ক টিয়েলেমানস ঠান্ডা মাথায় ১২৫ মিনিটে গোলপোস্টের ডানদিকে জড়িয়ে দেন বল। লাল সমর্থকরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। ৩-২ গোলে এগিয়ে থেকে সময়ক্ষেপণের কৌশল নেয় তারা। খুব দ্রুতই অতিরিক্ত সময় শেষ হয়। শেষের বাঁশি বাজান রেফারি। একদিকে বিজয় উল্লাস, অন্যদিকে তেরেঙ্গা সিংহের ভেঙে পড়ার নিদারুণ কষ্টের ছবি। চাঁদনি রাতেও অদৃশ্য বাজে যেন পিষ্ট হয়েছেন পরাজিত খেলোয়াড়রা। সবকিছু হারিয়ে ফেলা মানুষের যা হয়, তা-ই হয়েছিল সেনেগাল ফুটবলারদের। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছুঁয়েছে ইংলিশ সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিলকে। আইটিভিকে তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই বিশ্বাস করি না যে এটি পেনাল্টি ছিল। কারণ, রেফারি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অনেক সময় নেন। যেখানে রেফারির সিদ্ধান্ত দৃঢ় হবে, সেখানে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন তিনি।’

পেনাল্টি বিতর্ক ছাপিয়ে বেলজিয়ামের ঘুরে দাঁড়ানো এবং ম্যাচ জয়ের প্রশংসাও হয়েছে। বিবিসি রেডিও ফাইভকে ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ডিওন ডাবলিন বলেন, ‘ফুটবল আসলেই একটা পাগলাটে খেলা। আমি এই খেলার কোনো কিছুই অনুমান করতে পারি না।’

আয়ারল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিনের মতে, হেরে যাওয়া ম্যাচই জিতে নিল বেলজিয়াম। জয়ী দলের গার্সিয়া ম্যাচের প্রত্যাবর্তন নিয়ে বলেন, ‘ফুটবলে যতক্ষণ আপনি বিশ্বাস রাখেন, ততক্ষণ সবকিছুই সম্ভব।’

সেনেগালের থিয়াওর কণ্ঠে ছিল হতাশা, ‘আমরা বাদ পড়েছি– এটি কষ্টদায়ক।’ সেনেগালের কোচ পাপে চাও খেলোয়াড়দের বাহবা দেন। তাঁর মতে, ‘আমাদের দলকে বাহবা দিতেই হবে, সর্বস্ব উজাড় করে খেলেছে তারা। দুর্ভাগ্যবশত দুই গোলের লিড ধরে রাখতে পারিনি। এটি মেনে নিতে হবে। এটিই ফুটবল।’ পরাজয় মেনে নেওয়া কোচ রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

আরও পড়ুন

×