রদ্রিগেজের বুকে রেড ক্রস, হৃদয়ে স্পেন-চিলি
আহসান হাবিব সম্রাট
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ১০:২০
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া কোনো কোনো ফুটবলারের জীবনের গল্প নাটক-সিনেমার কাহিনীর চেয়ে যেন কম কিছু নয়। তেমনি একজন সুইজারল্যান্ড দলের তারকা ডিফেন্ডার রিকার্ডো রদ্রিগেজ। লা লিগা ক্লাব রিয়াল বেটিসের এই লেফট-ব্যাক গায়ে স্পেন ও চিলির জার্সি জড়ালেও অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। বরং স্প্যানিশ বাবা ও চিলিয়ান মায়ের সন্তান রিকার্ডোর জন্য সেটিই হতো স্বাভাবিক। রিকার্ডোও মনেপ্রাণে তা-ই চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যই যেন তাঁর স্থান নির্ধারণ করে রেখেছিল ‘রেড ক্রস’ শিবিরে। এ কারণে সুইজারল্যান্ডের জার্সি গায়ে মাঠে নামলেও এই রক্ষণভাগ তারকার বুট জোড়াতে এমব্রয়ডারিতে আঁকা থাকে স্পেন-চিলির পতাকা।
রিকার্ডোর বাবা হোসে ম্যানুয়েল রদ্রিগেজের জন্ম স্পেনের গ্যালিসিয়া অঞ্চলে। গ্যালিসিয়া অঞ্চলের অধিবাসীরা স্পেনের পৃথক আদিবাসী সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃত। যাদের ভাষা, সাহিত্য- সংস্কৃতি, শিল্প, খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে স্পেনের অন্য অঞ্চলের অধিবাসীদের মিল নেই। অনেকটা ইহুদি সম্প্রদায়ের মতো গ্যালিসিয়ানরা ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছেন। রিকার্ডোর বাবা এক সময়ে ভাগ্যান্বেষণে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমান। পরে তিনি মার্সেলা আরায়া নামে এক চিলিয়ান নারীকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ঘরে ১৯৯২ সালে জুরিখে জন্মগ্রহণ করেন রিকার্ডো। কিন্তু ‘ডায়াফ্রাম্যাটিক হার্নিয়া’ নামের এক জটিল রোগ নিয়ে পৃথিবীতে আসেন রিকার্ডো। বিরল এই রোগের কারণে চিকিৎসকরা তাঁর বেঁচে থাকা নিয়ে সংশয় জানিয়েছিলেন। জন্মের প্রথম তিন বছরে ছয় মাস অন্তর নিয়মিতভাবে রিকার্ডোর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হতো। শারীরিক জটিলতা কেটে যাওয়ার পর বড় ভাই ফ্রান্সিসকো রদ্রিগেজের সঙ্গে ফুটবল খেলতে শুরু করেন রিকার্ডো। পরে পেশাদার ফুটবলার হিসেবে এফসি জুরিখে ক্যারিয়ার শুরু করেন।
১৭ বছর বয়সে সুইজারল্যান্ডের প্রথম বিভাগের আসরে অংশ নেন। দ্রুতই তিনি সুইজারল্যান্ডের বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে সুযোগ পান। ২০০৯ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ জেতা সুইজারল্যান্ড দলের সদস্য ছিলেন রিকার্ডো। যে দলে তাঁর সতীর্থ ছিলেন অন্য বিখ্যাত সুইস তারকা গ্রানিত জাকা। এরপর দ্রুত সুইস অনূর্ধ্ব-১৮, ১৯ ও ২৩ দলে সুযোগ পান। সিনিয়র জাতীয় দলে ডাক পেতেও সময় লাগেনি। ২০১১ সাল থেকে রিকার্ডো সুইজারল্যান্ডের অলিম্পিক, উয়েফা চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ দলের নিয়মিত মুখ। এক যুগের বেশি সময় ধরে রেড ক্রস রক্ষণদুর্গের অন্যতম স্তম্ভ ৩৩ বছর বয়সী রিয়াল বেটিসের এ তারকা।
রিকার্ডোর পিতৃভূমি স্পেনের হয়ে না খেলার ইচ্ছা ছিল কৈশোর থেকেই। ২০০৯ সালে রেড ক্রস জার্সি গায়ে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ জেতার পর ‘লা ভোজ দি গ্যালিসিয়া’ নামে একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে একজন গ্যালিসিয়ান মনে করি। আমার বাবা সেখানে জন্মগ্রহণ করেছেন। আমার পরিবারের একটি অংশ গ্যালিসিয়ান। আমরা সুযোগ পেলেই গ্যালিসিয়ায় ফিরে যাই এবং সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাই। কখনও কখনও ভিগো শহরের চারপাশে ঘুরে বেড়াই এবং দাদির দেওয়া আলুভাজা খাই।’
২০১৫ সালে ক্যান্সারে মারা যান রিকার্ডোর মা। মায়ের সূত্রে চিলিয়ান পাসপোর্টও রয়েছে ক্লাব পর্যায়ে এসি মিলান, ভুলসবার্গ, পিএসভি ও তুরিনোতে খেলা এই ডিফেন্ডারের। চিলির প্রতিও গভীর টান রয়েছে এই সুইস ফুটবলারের, ইচ্ছা ছিল মায়ের দেশ চিলির জার্সিতেও মাঠে নামার। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। চিলিয়ান সংবাদপত্র লা টেরসেরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিকার্ডো বলেন, ‘আমি চিলির ফুটবল ফেডারেশন থেকে ডাক আশা করেছিলাম। কিন্তু চিলির কোন কোচ আমাকে কখনো বিবেচনা করেননি। স্পেনের হয়েও খেলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু স্পেন কর্তৃপক্ষও কখনো আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। একমাত্র সুইজারল্যান্ডই আমাকে প্রস্তাব করেছে এবং সে কারণে আমি তাদের হয়েই খেলছি।’ রিকার্ডোর বক্তব্যেই ফুটে ওঠে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সুইজারল্যান্ডের রেড ক্রস জার্সি পরে মাঠে নামলেও মনের গভীরে আসলে একসঙ্গে তিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি।
- বিষয় :
- সুইজারল্যান্ড
- স্পেন
- চিলি
- ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬
