করোনা সংকট
স্পেনের `শীতঘুম` ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
ড. তারেক শামসুর রেহমান
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২০ | ১০:৫৭ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
স্পেনের সরকার আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সে দেশের নাগরিকদের 'হাইবারন্যাশন'-এ যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। কেননা, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের হাসপাতালে রাখার আর জায়গা নেই (নিউইয়র্ক টাইমস, ৩১ মার্চ)। মানুষজন যাতে রাস্তায় বেরিয়ে করোনা রোগের সংক্রমণের হার বাড়িয়ে না দেয়- উদ্দেশ্য মোটামুটি এটাই। সাধারণত মরু অঞ্চলের ভল্লুক কিংবা বাদুড়ের ক্ষেত্রে এই 'হাইবারন্যাশন' শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ গভীর ঘুমে যাওয়া। শীতের সময় মরু ভল্লুক সাধারণত ২-৩ মাস কিছু না খেয়ে গভীর ঘুমে চলে যায়। এখন কিনা স্পেনের সরকারই প্রতীকী অর্থে তাদের নাগরিকদের গভীর ঘুমে যাওয়ার কথা বলছে। বুঝতে কারও বাকি থাকে না, স্পেনের পরিস্থিতি আজ কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, সেখানে হাইবারন্যাশনের কথা বলা হয়েছে! যারা করোনাভাইরাস মনিটর করে তারা আমাদের জানাচ্ছে (ওয়ার্ল্ডওমিটার), এ যাবৎ ২০৫টি দেশ করোনাভাইরাসে (কভিড-১৯) আক্রান্ত। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে স্পেনের মৃত্যুহার বেশি। প্রতি ১০ লাখে মৃত্যুহার ২৫৬ (চীনের মাত্র দু'জন, যুক্তরাষ্ট্রে ২৬)।
সবচেয়ে খারাপ খবর এসেছে লাতিন আমেরিকার ইকুয়েডর আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ইকুয়েডরে করোনাভাইরাসে মারা গেছেন এমন অনেক মানুষ রাস্তায় পড়ে রয়েছে- টিভি চ্যানেলে এ ধরনের দৃশ্য অনেকে দেখে থাকবেন। আয়ারল্যান্ডে শত শত কবর আগেই খোঁড়া হয়েছে- এ ধরনের ছবিও আছে সংবাদপত্রে। সবচেয়ে ভয়ের কথা শুনিয়েছেন হোয়াইট হাউসের করোনাভাইরাস বিষয়ক টাস্কফোর্সের কর্মকর্তা ডা. ডেবোরা ব্রিস্ট্ক্র। তিনি বলেছেন, সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং বা সামাজিক দূরত্ব মেনে না চললে যুক্তরাষ্ট্রে মৃতের সংখ্যা হতে পারে ১৫ থেকে ২২ লাখ পর্যন্ত। তার মতে, এক লাখ মৃত্যু কোনোমতেই এড়ানো যাবে না। যারা নিয়মিত সংবাদপত্রের পাঠক তারা জানেন, নিউইয়র্কের পরিস্থিতি কত ভয়াবহ! নিউইয়র্ক বাহ্যত একটি পরিত্যক্ত নগরীর মতোই মনে হয়। টোটাল শাটডাউন। এই শাটডাউন কতদিন পর্যন্ত চলবে, কেউ তা বলতে পারে না। রোগটি যাতে সংক্রমিত হতে না পারে, সে জন্যই বলা হচ্ছে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিংয়ের কথা। অর্থাৎ পাশাপাশি না থেকে কিছুটা দূরত্বে থেকে চলাফেরা করা। উদ্দেশ্য পরিস্কার- ভাইরাসটি যাতে সংক্রমিত না হয়। 
আমরা টিভিতে দেখলাম, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে বাজারে গিয়ে গোল চিহ্ন এঁকে দিয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করছেন। বিশেষজ্ঞরা এই সামাজিক দূরত্বের কথা বারবার বলছেন। লন্ডনের ম্যাথমেটিক্যাল বায়োলজির অধ্যাপক ফার্গুসন জানিয়েছেন, সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখলে ব্রিটেনে ৫ লাখ আর যুক্তরাষ্ট্রে ২২ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য এটা ভয়ের কারণ। ব্লুমবার্গের গবেষকদের মতে, ভারত হচ্ছে পরবর্তী রাষ্ট্র, যেখানে করোনাভাইরাসের কারণে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে!
আমাদের ভয়ের কারণ বাংলাদেশকে নিয়েও। এখানে সাধারণ মানুষের মাঝে কোনো সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হয় না। যেখানে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে, সেনাবাহিনী রাস্তায় নামানো হয়েছে, সেখানে টিভি চ্যানেলগুলো বলছে, অকারণে মানুষ রাস্তায় জমায়েত হচ্ছে, গাড়ি নিয়ে বের হচ্ছে, পাড়া-মহল্লায় জটলা করছে। একজন সংবাদকর্মী ২ এপ্রিলের একটি ছবি পোস্ট করেছেন ফেসবুকে। কুড়িল বিশ্বরোডের ছবি, সেখানে যানজট। তাহলে প্রশ্ন ওঠে- সেনাবাহিনী কোথায়? এখানে লকডাউন কাজ করল না কেন? পুলিশ আর সেনাবাহিনী দিয়ে কি সাধারণ মানুষের সচেতনতা তৈরি করা যাবে? আরেকজন একটি পোস্ট দিয়েছেন ফেসবুকে। তাতে দুটি ছবি- একটি বাংলাদেশের কোনো একটি ব্যাংকের; অপরটি সম্ভবত ফিলিপাইনের একটি ব্যাংক। দুটি ব্যাংকের লেনদেনের কর্মকাণ্ড ভিন্নতর। বাংলাদেশে যেখানে ব্যাংকের ভেতরে গ্রাহকরা সবাই গাদাগাদি করে তাদের কাজ সারছেন, সেখানে ওই দেশে নিরাপদ দূরত্বে থেকে লাঠির মাথায় লাগানো ঝুড়ির মাধ্যমে চেক কিংবা অন্য কাগজপত্র সংগ্রহ করছেন। যেখানে করোনাভাইরাসটি কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি, সেখানে বাংলাদেশে মানুষজন গাদাগাদি করে তাদের কাজ সারছেন। এ ধরনের শত শত দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে। আরেকটি ছবি- তাতে দেখা যায়, একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের মাস্ক বা গ্লাভস না নিয়ে এক দুস্থকে এক 'মগ' চাল দিচ্ছেন। মগে করে চাল দেওয়ার ছবি আবার ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। করোনা সম্পর্কে ধারণা তাদের থাকার কথা। তাহলে গাদাগাদি করে কোনো ধরনের সুরক্ষা না নিয়ে ত্রাণ বিতরণের (এক মগ চাল!) ছবি তুলে তা প্রকাশ করার উদ্দেশ্য কী? একজন মন্ত্রীর খবর ছাপা হয়েছে মিডিয়ায় (বিডিনিউজ ২৪.কম), যেখানে তিনি করোনাভাইরাস নিয়ে কথা বলছেন। মুখে মাস্ক নেই। মঞ্চে পুলিশ কর্মকর্তারাও উপস্থিত, তাদের কারও মুখে মাস্ক নেই। সমকালের ৫ এপ্রিলের একটি খবর- এবার ঢাকামুখী জনস্রোত। একটি ছবিও আছে। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের বক্তব্যও আছে ওই প্রতিবেদনে, যেখানে তিনি বলেছেন, 'জেলা মোটর মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে তাদের (গার্মেন্টকর্মী) গন্তব্যে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।' যেখানে সবাইকে ঘরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে সরকার, সেখানে তিনি কারখানা শ্রমিকদের ঢাকা পাঠান কীভাবে?
আমরা, আমজনতা করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছি বলে মনে হয় না। না হলে ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোডের মতো গুলশান-বনানী সড়কেও এত গাড়ির ভিড় কেন? আমাদের সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। এ জন্য পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে আরও শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। কড়াকড়ি আরোপ না করলে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের ফাঁদে আমরা পড়ে যেতে পারি! আমার নিজের সুবিধার জন্য আমি হাজার মানুষের বিপদ ডেকে আনতে পারি না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে ১৬ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময়টা সবচেয়ে খারাপ। এ ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থানে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। ভারতের মতো দেশ 'টোটাল লকডাউন' করেছে। বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এক শহর থেকে অন্য শহরের সব যোগাযোগ ব্যবস্থা। হেঁটে ফিরে যাওয়ার দৃশ্যও আমরা দেখেছি; কিন্তু তা নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়া; চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য নয়। এই মুহূর্তে বিশ্বের জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশ করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউন (বিজনেস ইনসাইডার, ৪ এপ্রিল)। লকডাউন বলতে বোঝায় বাধ্যতামূলক ঘরে থাকা, কিছু কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিপূর্ণভাবে বন্ধ রাখা এবং সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করা। হু'র পক্ষ থেকে এ ধরনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। মক্কা-মদিনা ও জেদ্দার মতো শহরে কিংবা থাইল্যান্ডে সব ধরনের জমায়েত এড়াতে কারফিউ পর্যন্ত জারি করা হয়েছে। রাশিয়াতে বেতনসহ এক সপ্তাহ বাড়িতে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকাতে লকডাউন শুরু হয়েছে ২৬ মার্চ থেকে। নিউজিল্যান্ডে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক হোম কোয়ারেন্টাইন শুরু হয়েছে ২৫ মার্চ থেকে। আর ভারতেও পূর্ণ লকডাউন শুরু হয়েছে ২৪ মার্চ থেকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব এ ধরনের মহাসংকটে আর পড়েনি। চীন এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সফলতা পেলেও (উহানে ৮০ শতাংশ ফ্যাক্টরি চালু হয়েছে); পুঁজিবাদী বিশ্ব যে পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ- তার প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ইতালি আর স্পেনের মতো দেশ। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। অথচ হাসপাতালগুলোতে যে প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটর দরকার, তা যুক্তরাষ্ট্রের নেই। আরও মজার ব্যাপার, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার যে কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, সেই কোম্পানি (উরাল ইন্সট্রুমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং প্ল্যান্ট, চেলিয়াবিনস্ক, রাশিয়া) এখন যুক্তরাষ্ট্রে ভেন্টিলেটর সরবরাহ করছে (রয়টার্স, ৩ এপ্রিল)। রাশিয়ার পাশাপাশি চীন থেকেও এসেছে মেডিকেল যন্ত্রপাতি। একটি 'মানবিক যুক্তরাষ্ট্রের' দাবি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো মহল থেকে উচ্চারিত হচ্ছে। বিশ্ব এ থেকে কবে নাগাদ পরিত্রাণ পাবে বলা মুশকিল। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সংকট অব্যাহত থাকবে বলেই কারও কারও অভিমত।
স্পেন হাইবারন্যাশনে গিয়েও করোনাভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। সেখানে সামাজিক দূরত্বের বিষয়টিকে অত্যন্ত কঠোরভাবে মানা হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য একটা শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল। সাধারণ মানুষ এখনও সচেতন নয়। গণপরিবহন বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা, উৎপাদনশীল সব কলকারখানা পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা এবং সেই সঙ্গে সেখানে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য রক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা, দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপনসহ চিকিৎসাকর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে করোনাভাইরাস মোকাবিলা করা এই মুহূর্তে জরুরি। এ জন্য সব রাজনৈতিক দলের এই মুহূর্তে সরকারের পাশে থাকা উচিত।
[email protected]
অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক
